চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম মৌসুমের শেষ ভাগে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আম চাষীদের অধিক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য নাবি জাতের আম উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা। ‘বারি আম-১৯’ নামে নতুন জাতের আম। বর্তমানে আমটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, অনুমোদন মিললে আগামী মৌসুম থেকেই চাষিদের কাছে এ জাতের চারা সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
দেশের আম গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকদের দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল এই নতুন জাত। এ কেন্দ্র থেকে এর আগে ১৬টি আমের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দেশের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্র মিলিয়ে বারির উদ্ভাবিত আমের জাতের সংখ্যা বর্তমানে ১৮। নতুন জাতটি অনুমোদন পেলে সেটিই হবে সর্বশেষ সংযোজন।
গবেষকদের মতে, দেশের অধিকাংশ জনপ্রিয় আম মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বাজারে চলে আসে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আম বাজারজাত হওয়ায় সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অনেক চাষি কাঙ্ক্ষিত লাভ পান না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এমন একটি জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগস্ট মাসে ফল সংগ্রহের উপযোগী হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, আম চাষকে আরও লাভজনক করতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে ‘বারি আম-১৯’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে ফলন, স্বাদ, সংরক্ষণক্ষমতা, রোগবালাই প্রতিরোধ, পরিবহন উপযোগিতা এবং দেশের জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছে। সব ধরনের মূল্যায়ন শেষে জাতটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘অনুমোদন মিললে আগামী মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে চারা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসার কারণে এ জাতের আম তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।’’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘‘বর্তমানে বারির উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে ‘বারি আম-৪’ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তবে নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাজারে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা চলছে।’’
তিনি জানান, আগস্ট মাসে যখন অধিকাংশ আমের মৌসুম শেষ হয়ে যায়, তখন ‘বারি আম-১৯’ বাজারে এলে কৃষকরা বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে নতুন কোনো জাত দ্রুত সম্প্রসারণের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন শিবগঞ্জ প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম। তার মতে, একটি নতুন জাতের সফলতা শুধু ফলনের ওপর নির্ভর করে না। স্বাদ, রং, ঘ্রাণ, সংরক্ষণক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ, বাজার চাহিদা এবং ভোক্তাদের গ্রহণযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ায় অন্তত দুই বছর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করলে কৃষকরা বেশি উপকৃত হবেন।
এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে আম শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নতুন জাত অবশ্যই সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, তবে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ফজলি, ল্যাংড়া, খিরসাপাতসহ পুরোনো জাতগুলোর বাজার ও পরিচিতি রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, কিছু আমচাষী নতুন জাত নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। কানসাট ইউনিয়নের চাষি উমর আলী বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নতুন নাবি জাতের কারণে ঐতিহ্যবাহী অনেক আমের বাজার সংকুচিত হয়েছে। তার মতে, নতুন কোনো জাত কৃষকের হাতে দেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই ধরনের মত দিয়েছেন শ্যামপুর ইউনিয়নের আমচাষি মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবছর নতুন জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় পুরোনো বাগানের মালিকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। তবে যদি ‘বারি আম-১৯’ সত্যিই আগস্ট মাসে ভালো ফলন দেয় এবং বাজারে উচ্চমূল্য নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে।
যথাযথ অনুমোদন ও পরিকল্পিত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ‘বারি আম-১৯’ দেশের আম শিল্পে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে মৌসুমের শেষভাগে বাজারে দেশীয় আমের সরবরাহ ধরে রাখতে পারলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তারাও দীর্ঘ সময় দেশীয় আম উপভোগের সুযোগ পাবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









