সিলেট বিভাগে সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে বন্যাকবলিত এলাকার পানি। তবে পানি কমার সাথে সাথেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে ক্ষতচিহ্ন। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠছে। এ ছাড়াও বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জের ১০ গ্রামে প্লাবন
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারাসহ বিভাগের প্রধান নদীগুলোর পানি কমেছে এবং নদীগুলোর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট জেলায় নতুন করে কোথাও নদী ভাঙন বা বন্যার খবর পাওয়া যায়নি।
তবে সুনামগঞ্জের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। টানা বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলে কুশিয়ারা নদীর পানি সুনামগঞ্জ অংশে এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও, রানীগঞ্জ ও আশারকান্দি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বালিশ্রী-রৌয়াইল পাকা সড়কটি ভেঙে কুশিয়ারা নদীর পানি ঢুকে প্রায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে বিকল্প সড়ক না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকাযোগে যাতায়াত করছেন।
হবিগঞ্জে ঘরে ফিরছে বানভাসিরা, বেড়েছে দুর্ভোগ
জেলায় বন্যার পানি নামতে শুরু করায় আশ্রিত মানুষ নিজ ভিটাবাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে পানি কমলেও কমেনি দুর্ভোগ। রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়িতে কাদা জমে থাকায় অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে লস্করপুর, লামাতাসি ও পইল ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। পানি নামার সাথে সাথে ফসলি জমির ধানের চারা ও সবজি নষ্ট হওয়ার চিত্র সামনে আসছে। মাছ ভেসে যাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ঘেরের মালিকরা। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত সহায়তা প্রদান করা হবে এবং বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মৌলভীবাজারে ফসলের ক্ষতি, খাবার ও পানি সংকট
মৌলভীবাজারের রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় পানি কমতে শুরু করলেও গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষিখাতে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে। আউস ও আমন ধানের বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে এবং ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট।
এদিকে রাজনগর উপজেলার উজিরপুর গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে আশরাফ আলী নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নে নদীর তীর ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর বাঁধ ভাঙনে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্গত এলাকায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার এবং ১১০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ জানান, নদীর পানি ধীরগতিতে কমছে। নতুন করে বৃষ্টি না হলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
সিলেটে সুরমা কুশিয়ারার চার পয়েন্টে পানি বাড়ছে
সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। তবে সারিগোয়াইন, পিয়াইন, লোভাছড়া ও ধলা নদীর পানি কমছে। পাউবোর তথ্য অনুসারে, আজ বেলা ১২টায় সুরমা নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির স্তর ছিল ৯ দশমিক ৯১ সেন্টিমিটার। গতকাল বিকেল ৬টায় এই পয়েন্টে পানি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ নদীর এই পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর আমলশিদ পয়েন্টে পানির স্তর ছিল ১৪ দশমিক ৫৩ সেন্টিমিটার।
গতকাল বিকেল ৬টায় এই পয়েন্টে পানি ছিল ১৪ দশমিক ৫১ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ নদীর এই পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর শেওলা পয়েন্ট শূন্য দশমিক ৪ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে শূন্য দশমিক ১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবকটি নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন, বৃদ্ধি ও ঢল অব্যাহত থাকায় নদনদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









