বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অর্থনীতির সাথে ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাট ও পাট শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত ছিল এই পাট। পাট শিল্পের অবদান এখনো অনস্বীকার্য। প্রতি বছর দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি পাট চাষ এবং পাটকলের সাথে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন।
পাবনার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাট চাষ। তারই ধারাবাহিতায় পাবনায় এ বছর লক্ষ্যমাত্রার অধিক পাট রোপিত হয়েছে। সেই সাথে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। আশাব্যঞ্জক ফলন হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে কৃষকের মনে।
একইসাথে আষাঢ় মাসের শেষ দিকে এসেও গাজনার বিল ও আশেপাশের বিলে পানি না আশায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে ওই এলাকার কৃষক।
জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী চলতি বছরে চলনবিল বিল বেষ্টিত চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম, ছাইখোলা, হান্ডিয়াল ও মূলগ্রাম এলাকা, সুজানগর উপজেলার গাজনার বিল ও আশপাশের নিচু এলাকা, সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর, গৌরীগ্রাম, নাগডেমড়া ও ভুলবাড়িয়া এলাকা, ভাঙ্গুড়া উপজেলার চর-ভাঙ্গুড়া ও অন্যান্য বিল, পাবনা সদর উপজেলার মালঞ্চি, নারানপুর, সাদুল্লাহপুর ও আতাইকুলা এলাকার বিভিন্ন বিলে প্রচুর পরিমাণে পাট চাষ হয়েছে।
এছাড়া বেড়া, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও ফরিদপুর উপজেলার নদীর তীরবর্তী পলিবাহিত জমিতে সীমিত পরিসরে পাট চাষ হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর জেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার হেক্টর। তবে গত বছর দাম ভালো পাওয়ায় এ বছর লক্ষ্যমাত্রার অধিক (৪২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে) পাট চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে হওয়ায় এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে, বিঘাপ্রতি গড়ে ১০ মণ বা তার অধিক ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা যায়, পাট চাষে খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের পাট চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মানসম্মত পাট উৎপাদনকারী দেশ। প্রধানত কাঁচা পাট, পাটের সুতা (Yarn), চট এবং বস্তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।
নতুন বাজার: প্রচলিত বাজারের বাইরে বর্তমানে বহুমুখী পাটজাত পণ্য (যেমন- পাটের ব্যাগ, জুতো, কার্পেট, হস্তশিল্প) ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশের পাট শিল্প বেশ কিছু মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে:
সরকারি পাটকলের স্থবিরতা: লোকসানের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (BJMC) মিলগুলো বন্ধ বা লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বেসরকারি খাত এগিয়ে আসলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: দেশের বেশিরভাগ পাটকলেই পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ বেশি এবং মান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
বিকল্প পণ্যের আগ্রাসন: সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিক এবং সিন্থেটিক পণ্যের কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের তৈরি মোড়কের চাহিদা কমেছে।
ন্যায্য মূল্যের অভাব: পাট চাষিরা অনেক সময় উৎপাদন খরচ অনুযায়ী পাটের সঠিক মূল্য পান না, যার ফলে তারা পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত: বহুমুখী পাটজাত পণ্য (JMD) ঐতিহ্যবাহী চট ও বস্তার বাইরে পাটের বহুমুখী ব্যবহার এই শিল্পের নতুন আশার আলো। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে এখন প্লাস্টিকের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে।
বিশেষ উদ্ভাবন: পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি পচনশীল ‘সোনালী ব্যাগ’ (প্লাস্টিকের বিকল্প) এবং পাটের পাতা থেকে তৈরি চা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এছাড়া পাটকাঠি থেকে চারকোল (Charcoal) তৈরি করে তা বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









