সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটিতে অংশ না নিয়ে গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম মনি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
চিফ হুইপ জানান, কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, জোট ও স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হলেও তারা কোনো নাম না দেওয়ায় আপাতত ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
নবগঠিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। অন্য সদস্যরা হলেন— মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম (বরগুনা-২), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), জয়নাল আবেদিন (বরিশাল-৩), মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), হাবিবুর রহমান (ভোলা-১), মোহাম্মদ নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), সাকিলা ফারজানা (সংরক্ষিত মহিলা আসন-১), মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩) এবং মোহাম্মদ অলিউল্লাহ (বরগুনা-১)।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট
কমিটি গঠনের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কারণে তারা কমিটিতে অংশ নেবেন না এবং প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ থেকেও ওয়াকআউট করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিরোধী দলের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। তারা কখনোই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য মনোনয়ন দিতে সম্মত হননি।”
ডা. শফিকুর রহমানের বলেন, “নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট বিজয়ী হলে সেই রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় তারা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাই গণরায় উপেক্ষা করে সংসদীয় কমিটি গঠন গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটারের মতামত উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে জনগণের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে।”
ওয়াকআউটের পর বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক বিষয় হলেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী বাতিল করা প্রয়োজন। আর সেটি করতে হলে সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।”
মন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান করেছেন এবং সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তপশিলে এমন কোনো শপথের বিধান নেই। ফলে এ ধরনের শপথ আইনগতভাবে কার্যকর নয়।”
তিনি আরও বলেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। ভবিষ্যতে সংসদ চাইলে সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিধান সংযোজন করতে পারবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ' রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে জারি করা হয়েছে এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তাই সংসদের বাইরে বিকল্প কোনো কাঠামোর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই।”
তিনি বলেন, “সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের এবং ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ সেই ক্ষমতা সংসদকে দিয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ সংসদীয় প্রক্রিয়া।”
মন্ত্রী বলেন, “বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, গণমাধ্যমের সম্পাদক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ চূড়ান্ত করবে। এরপর সেই সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।”
একই সঙ্গে বিরোধী দলের প্রতি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী সংবিধান প্রণয়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









