চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটে ভেঙে পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জারি ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম ঘাটতি থাকায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গুরুতর ও জটিল রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে চিকিৎসকদের অনুমোদিত ৮৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪৭টি পদ। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের ৮টিই শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ জন। এছাড়া ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৮টি পদের মধ্যে ৬টি এবং সহকারী সার্জনের ২৮টি পদের মধ্যে ১৮টি পদই বর্তমানে খালি পড়ে রয়েছে। গত এক মাসে সাতজন চিকিৎসক বদলি হলেও নতুন যোগদান করেছেন মাত্র একজন।
সরেজমিনে গত বুধবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় রোগীদের দীর্ঘ লাইন। শাহাবাজপুর ইউনিয়ন থেকে নাতনিকে নিয়ে শিশু চিকিৎসকের খোঁজে একতলা থেকে দোতলায় হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন মাহতাব উদ্দিন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও চিকিৎসক না পেয়ে হতাশ হয়ে তিনি বলেন,
"শিশু ডাক্তারকে খুঁজছি, কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। দোতলায় এতক্ষণ বসে থেকেও কোনো ডাক্তারের দেখা মিলল না।"
চর অনুপনগরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, গত সোমবার তাঁর মা ফাতেমাকে ভর্তি করালেও পরদিন সকালে তাঁকে রাজশাহী পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এখানে ভর্তি করে লাভ কী, যদি চিকিৎসা না পাওয়া যায়?"
হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারেরও বেশি রোগী আসেন এবং ২৫০ শয্যার বিপরীতে সার্বক্ষণিক ভর্তি থাকেন প্রায় ৫০০ রোগী। বহির্বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একনাগাড়ে তাঁদের প্রায় ২০০ করে রোগী দেখতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালটির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ইসলামপুর ইউনিয়নের আসিয়া খাতুন জানান, স্বামী তরিকুল ইসলামকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। এখানকার নোংরা টয়লেট ও দুর্গন্ধে তিনি নিজেই এখন অসুস্থ হওয়ার উপক্রম।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মাহবুব হাসান বলেন,
"২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল আমরা এখনো পাইনি। তার ওপর সম্প্রতি কয়েকজন চিকিৎসক পদোন্নতি পেয়ে বদলি হওয়ায় সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১১ জন (রাজস্ব ও মাস্টাররোল মিলিয়ে) কর্মরত আছেন। এই সীমিত সম্পদ দিয়েই আমরা সেবা সচল রাখার চেষ্টা করছি।"
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগ বা পদায়ন হলে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল অকপটে চিকিৎসক সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, বদলিজনিত কারণে সাময়িক এই দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুতই ডাক্তার সংকট দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ প্রশাসক হারুনুর রশিদও একই আশ্বাস দিয়ে জানান, চিকিৎসকদের প্রমোশনের কারণে বদলি হওয়া শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নতুন চিকিৎসক পদায়নের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ চলছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









