দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান পাবনা পৌরসভা। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পৌরসভা ১৯৮৯ সালে দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা লাভ করলেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাগরিক সেবার মান বাড়েনি। বরং জনবল সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংরক্ষণের অভাবে পৌরসভার কার্যক্রম আজ নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে ভবনে বর্তমানে পৌরসভার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটিকে ২০১২ সালেই সরকার পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল। দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা হাজারো নাগরিককে প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যেই অবস্থান করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে আধুনিক সেবাদানের লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েকটি নতুন যানবাহন সংগ্রহ করা হলেও সেগুলো সংরক্ষণের জন্য কোনো গ্যারেজ বা শেড নেই। ফলে খোলা আকাশের নিচে রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে যানবাহনগুলো রাখা হচ্ছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই মূল্যবান সরকারি সম্পদের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ৭১ জন। প্রায় ২৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌর এলাকায় রয়েছে প্রায় ২২০ কিলোমিটার সড়ক। অথচ পুরো এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা মাত্র ১৯৪ জন। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার সড়কের জন্য একজনেরও কম কর্মী রয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কারে কাজ করেন মাত্র ৪৫ জন। দীর্ঘদিন নতুন নিয়োগ না হওয়ায় সীমিত জনবল দিয়েই সব ধরনের নাগরিক সেবা পরিচালনা করতে হচ্ছে।
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হুমায়ূন আহমেদ বলেন, বছরের প্রায় পুরো সময়ই ময়লা-আবর্জনা ও অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে সেই ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে।
রাধানগর এলাকার বাসিন্দা বাচ্চু মণ্ডল বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে শুধু কর বাড়ানোর উদ্যোগ ও কর আদায়ের তাগাদা দেখা যায়। কিন্তু নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনগণ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ফোরকান রেজা বাদশা বিশ্বাস বলেন, পাবনা পৌরসভার নাগরিক হিসেবে আমরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। শতবর্ষের বেশি পুরোনো এই পৌরসভায় এখনও কাঙ্ক্ষিত সেবার মান নিশ্চিত হয়নি। আমরা দ্রুত নাগরিক সেবার উন্নয়ন চাই।
বিসিক শিল্পনগরীর সভাপতি আফজাল হোসেন রাজা বলেন, পৌরসভার প্রায় প্রতিটি খাতেই সমস্যা রয়েছে। এসব সংকট নিরসনে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে পাবনা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পৌরসভার সেবার মান উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সহযোগিতায় প্রবৃদ্ধি প্রকল্পে পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য গত ৭ জুলাই আবেদন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে নাগরিক সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঐতিহ্য, জনসংখ্যা ও গুরুত্বের দিক থেকে পাবনা পৌরসভা জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, কেবল পরিকল্পনা নয়—দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পরিবর্তে আধুনিক প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, জনবল বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব পৌরসভা হিসেবে পাবনাকে গড়ে তোলা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









