দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার হাবলুহাট বাজার সংলগ্ন দামাইক্ষেত্র গ্রামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বিধবা সুরু বালার দীর্ঘদিনের কষ্টে গড়ে তোলা সংসার। আগুনে চারটি বসতঘর, একটি রান্নাঘর, দুটি ছাগল, নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা, প্রায় দুই লাখ টাকার আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। এতে পথে বসেছে পরিবারটি।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যায় আনুমানিক ৭টার দিকে সুরু বালার বাড়িতে আগুনের ঘটনা ঘটে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার পরিবারের সদস্যরা একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। বাড়িতে কেবল একটি ছোট ছেলে অবস্থান করছিল। স্থানীয়রা আগুন দেখতে পেয়ে নেভানোর চেষ্টা করলেও ততক্ষণে আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে তাদের পৌঁছানোর আগেই আগুনে বসতবাড়ির সবকিছু পুড়ে যায়।
সুরু বালা জানান, মাত্র চার মাস আগে বড় মেয়ে লতা রায়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের সময় স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে তাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ করতে হয়েছিল। পরে সেই দেনা পরিশোধের জন্য একটি এনজিও থেকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ তুলে ঘরে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই টাকাও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সারা জীবনের কষ্টের সম্বল এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। মেয়ের বিয়ের দেনা শোধ করার জন্য ঋণের টাকা তুলে রেখেছিলাম। সেই টাকাও আগুনে পুড়ে গেছে। এখন কোথা থেকে শুরু করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
বড় মেয়ে লতা রায় বলেন, বিয়ের সময় মা অনেক কষ্ট করে সবকিছু করেছেন। এখনও সেই দেনা শোধ হয়নি। আগুনে মায়ের সব শেষ হয়ে গেছে। মায়ের এই অসহায় অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারের কাছে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানাই।
ছোট মেয়ে দিশা রায় বলেন, আমার অনার্সের ফরম পূরণের জন্য টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম। সেই টাকাও আগুনে পুড়ে গেছে। আমার শিক্ষাসংক্রান্ত সব সার্টিফিকেট ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও আগুনে নষ্ট হয়েছে। এখন কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাব, জানি না।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, এই পরিবারের ক্ষতি অপূরণীয়। তাদের দুঃসময়ে সরকার ও আমরা সবাই পাশে আছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
বীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে শুকনা খাবার, পোশাক এবং প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পরিবারটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা যাতে দ্রুত পৌঁছায়, সে বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। পরিবারটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
স্থানীয়রা জানায়, স্বামী মৃত যতীশ চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও সুরু বালা দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে তাঁর সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে দ্রুত পুনর্বাসন এবং শিক্ষার্থী দিশা রায়ের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে সরকারি ও সমাজের বিত্তবান মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









