সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল ভাইরাল হওয়া নিজের একটি রিলস ভিডিও নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভিডিওটি কেন্দ্র করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। এ ঘটনায় তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন।
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বিউটি রানী পাল বলেন, ‘‘ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি স্কুল চলাকালে নয়, বিদ্যালয় ছুটির পর সহকর্মীদের সঙ্গে ধারণ করা হয়েছিল।’’
তিনি বলেন, “আমি আসলে রিল বানাতে জানি না। এক সহকর্মীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কীভাবে রিল তৈরি করা হয়। স্কুল ছুটির পর স্কুল প্রাঙ্গণে আমি হেঁটেছি, আর তিনি ভিডিওটি ধারণ করেছেন।”
তার অভিযোগ, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সম্পাদক আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ তার অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে প্রকাশ করেন। পাশাপাশি নিজের ফেসবুকেও তাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
বিউটি রানী পাল বলেন, “তিনি আমার ভিডিও ডাউনলোড করে নিউজ করেছেন এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে আমাকে নিয়ে আজেবাজে লিখেছেন।”
তার দাবি, আসিফ ইকবাল হিরণের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে এমন কাজ করেছেন। পরে ফোন করে ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত করার চেষ্টা করেন। ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে অভিযোগ করেন এই শিক্ষিকা।
তিনি বলেন, ‘‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয় বা অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষকদের জন্য পৃথক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবিও জানান তিনি।’’
এ ঘটনায় শুক্রবার (২৪ জুলাই) ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ এবং আসিফ ইকবাল হিরণের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন বিউটি রানী পাল। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন করে ‘প্রিয় ফেঞ্চুগঞ্জ’ নামের আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকেও তাকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে। অভিযুক্তরা ভুল স্বীকার না করলে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করবেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’-এর ফেসবুক পেজে দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ বলেন, “বিষয়টিকে আমরা অন্যায় হিসেবে দেখছি না। এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।”
এদিকে গতকাল রবিবার (২৬ জুলাই) সিলেট সফরকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘তিনি ভিডিওটি দেখেননি। তবে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছেন, এতে কোনো অশ্লীলতা নেই।’’
তিনি বলেন, “গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না। কেউ একমত হোক বা না হোক, আমার অবস্থান সেটিই।”
জিডি বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি মো. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘‘একজন শিক্ষক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার বিউটি রানী পাল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিলস ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরে একটি বাংলা গানের সঙ্গে তাকে হাঁটতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। অনেক শিক্ষক নিজ নিজ বিদ্যালয়ের সামনে একই ধরনের রিল ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা কর্মকর্তারাও রিল ভিডিও পোস্ট করাকে কোনো অপরাধ হিসেবে দেখছেন না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বিউটি রানী পাল ২০১৬ সাল থেকে পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে পাঠদান ও পরিবেশবিষয়ক নানা কার্যক্রমে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে তিনি সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পদক অর্জন করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









