দীর্ঘ প্রায় এক দশকের অপেক্ষা, পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেড) নির্মাণকাজ। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রাথমিকভাবে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আনোয়ারায় প্রকল্পটির গ্রাউন্ডব্রেকিং ও অবকাঠামো উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম।
অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ বাংলাদেশ ও চীনের সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আনোয়ারার এই বিনিয়োগ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি বলেন, সরকার কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল এক লাখেরও বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামোসহ সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, এই প্রকল্পের সুফল শুধু আনোয়ারাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠবে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, বিভিন্ন সেবাখাত এবং কর্মীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পকারখানার পাশাপাশি আবাসন, পরিবহন, লজিস্টিকস, সেবাখাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একসময় চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার ছিল, পরে বিনিয়োগ অংশীদার হয়েছে এবং বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগে প্রকল্পটির ভিত্তি স্থাপন করা হয়। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং অবকাঠামোগত পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন জটিলতায় প্রায় এক দশক ধরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়নে নতুন গতি আসে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারায় প্রায় ৭৮৩ একর সরকারি জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে এবং ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে। ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি বহুমুখী জেটি, জেটি সংযোগ সড়ক, চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানা দেয়াল নির্মাণ করা হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে। এখানে বস্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, মেডিক্যাল ডিভাইস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ও অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে উঠবে।
কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং বন্দর ও বিমানবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে সিইআইজেড ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









