এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস। মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পাবনা সফরে এসে বারবার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা-পাবনা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর। সময় গড়িয়েছে, সরকার ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু বদলায়নি পাবনাবাসীর দীর্ঘ অপেক্ষা।
প্রায় ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথে এখনো ঢাকা থেকে সরাসরি কোনো আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়নি। অথচ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের ঢাকায় যাতায়াতের প্রয়োজন দিন দিন বাড়ছে। ফলে পাবনাবাসীর প্রশ্ন—একটি আন্তঃনগর ট্রেনের জন্য আর কত অপেক্ষা করতে হবে?
২০১৮ সালের ১৫ জুলাই ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামে ট্রেন চালুর মধ্য দিয়ে ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথে বর্তমানে রাজশাহী-পাবনা-ঢালারচর রুটে ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ নামে মাত্র একটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। শুরু থেকেই পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন জেলার মানুষ।
সর্বশেষ গত ২০ জুন পাবনা সার্কিট হাউজে এক মতবিনিময় সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম চলতি বছরের আগস্টে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা দেন। এতে নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠেন পাবনাবাসী।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ও পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনো তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পৌঁছেনি।
পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের পরিবহন কর্মকর্তা মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘পাবনা-ঢাকা রুটে ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ডেপুটি চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট গৌতম কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘এ বিষয়ে রেলভবন থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। ট্রেন চালুর বিষয়ে রেলভবনই বিস্তারিত জানাতে পারবে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম জানান, ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি বলেন, একটি নতুন ট্রেন চালুর জন্য ইঞ্জিন, কোচ, জনবল ও সময়সূচিসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। এসব বিষয় নিয়েই রেল কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম এবং তৎকালীন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সচিব এহছানুল হক ঢাকা-পাবনা রুটে ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পাবনা সফর করেন। তখনও দ্রুত ট্রেন চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া ২০২৩ সালের ১৬ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা দেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রেলওয়ের ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে সেই ঘোষণাও বাস্তবায়িত হয়নি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, পাবনা-ঈশ্বরদী রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সে সময় জমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে এক জনসভায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় ঈশ্বরদীর মাঝগ্রাম থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত প্রায় ৭৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এতে ১১টি রেলস্টেশন, ১০২টি ছোট সেতু, ১১টি বড় সেতু ও ৫০টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি অধিগ্রহণ করা হয় ১ হাজার ১৪ দশমিক ২১ একর জমি।
২০১৮ সালে রেলপথ চালুর সময় ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামে ট্রেন চালু করা হলেও ২০২০ সালে ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পর নতুন ট্রেন না বাড়িয়ে শুধু নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’। ফলে দীর্ঘদিন পরও পুরো রেলপথে চলাচল করছে মাত্র একটি আন্তঃনগর ট্রেন।
বছরের পর বছর ধরে একের পর এক প্রতিশ্রুতি এলেও বাস্তবে ঢাকা-পাবনা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন এখনো অধরাই। তাই পাবনাবাসীর কণ্ঠে এখন একটাই প্রশ্ন—পূরণ হবে তো আগস্টে সরাসরি ট্রেনের যোগাযোগ?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









