ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে টেলিগ্রাম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, দ্রুত যোগাযোগ এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই অ্যাপ ব্যবহার করেন। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, টেলিগ্রামের কিছু চ্যানেল ও গ্রুপ অপরাধী চক্র, উগ্রপন্থী সংগঠন এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেলিগ্রামকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবার সেই বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে, কারণ রাশিয়া টেলিগ্রামের সহপ্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসে সহায়তা’ করার অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) দাবি করেছে, টেলিগ্রাম তাদের অনুরোধ সত্ত্বেও এমন অনেক চ্যানেল, চ্যাট ও বট বন্ধ করেনি, যেগুলো ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাশিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাশকতা, সন্ত্রাসী হামলা, গণহত্যার পরিকল্পনা এবং সাইবার প্রতারণার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে পাভেল দুরভ বা টেলিগ্রামের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) টেলিগ্রামের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে একটি প্রতীকী ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে রাশিয়ার অভিযোগের প্রতি টেলিগ্রামের পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।
রাশিয়া ও টেলিগ্রামের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। রাশিয়ার সরকার দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় বিদেশি যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশটি নিজেদের তৈরি রাষ্ট্র-সমর্থিত ‘ম্যাক্স’ মেসেঞ্জার ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, এই সেবায় ব্যবহারকারীদের তথ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করা হতে পারে এবং এতে টেলিগ্রামের মতো পূর্ণাঙ্গ এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন নেই। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পাভেল দুরভ রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফ্রান্সের নাগরিক। ২০১৩ সালে তিনি টেলিগ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে তিনি রাশিয়ার জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিকোনতাকতে (ভিকে) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে রুশ কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে নিজের অংশীদারিত্ব বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে যান। দুরভ বহুবার অভিযোগ করেছেন যে, রাশিয়ার সরকার তাঁর কাছে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চেয়েছিল, বিশেষ করে ইউক্রেনপন্থী গণতন্ত্রকামী কর্মীদের তথ্য। তিনি দাবি করেন, তিনি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, শুধু রাশিয়াই নয়, ফ্রান্সেও টেলিগ্রামকে ঘিরে আইনি তদন্ত চলছে। অভিযোগ রয়েছে, প্ল্যাটফর্মটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেনি। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাভেল দুরভ। তিনি বরাবরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে টেলিগ্রামের প্রধান নীতি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে মামলা নয়; এটি প্রযুক্তি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে সরকারগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চাইছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও স্বাধীন যোগাযোগের অধিকার রক্ষার কথা বলছে। এই দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোবে, তা শুধু টেলিগ্রাম বা রাশিয়ার জন্য নয়, বিশ্বের কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









