গাজীপুর মহানগরের বাসন থানার পালেরপাড়া এলাকায় গৃহবধূ মিম আক্তার (২৮) হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান আসামি ও নিহতের স্বামী মো. আলম হোসেনকে (২৯) বরিশাল থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে উঠে এসেছে, স্ত্রীর বেতনের টাকা জুয়ায় হারানোকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহের একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পিবিআই গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই জানায়, ২৮ জুলাই ভোরে পালেরপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে গার্মেন্টসকর্মী মিম আক্তারের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম ওরফে রানা বাদী হয়ে বাসন থানায় নিহতের স্বামী আলম হোসেন ও শাশুড়ি জাহানারা বেগমকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হলে সংস্থাটি তদন্তভার গ্রহণ করে এবং ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ছয় বছর আগে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বাসিন্দা মিম আক্তারের সঙ্গে আলম হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের তিন বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের পালেরপাড়ায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন তারা। মিম একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন, আর শারীরিক অসুস্থতার কারণে আলম নিয়মিত অটোরিকশা চালাতে পারতেন না। ফলে সংসারে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট চলছিল।
পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই বেতন পাওয়ার পর মিম পাঁচ হাজার টাকা ঘরের ড্রয়ারে রাখেন। ২৭ জুলাই রাতে ওষুধ কেনার জন্য টাকা নিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান টাকা নেই।
এ বিষয়ে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে আলম হোসেন স্বীকার করেন, তিনি ওই টাকা জুয়া খেলায় হারিয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে নিরাপত্তার জন্য মিম তার বোনের বাসায় আশ্রয় নেন। একই রাতে আলম হোসেন ও তার মা জাহানারা বেগম মিমকে বুঝিয়ে নিজেদের বাসায় ফিরিয়ে আনেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাত তিনটা থেকে চারটার মধ্যে ধারালো দা দিয়ে মাথা, মুখমণ্ডল, বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে এবং গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
হত্যার পরপরই পিবিআইয়ের ক্রাইম সিন ইউনিট ও তদন্ত দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্র বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত আলম হোসেনের অবস্থান নিশ্চিত হয়। পরে বৃহস্পতিবার ভোরে বরিশাল মহানগরের কোতোয়ালি থানার লঞ্চঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই বলছে, গ্রেপ্তারকৃত আলম হোসেন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং টাকার বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের তথ্য দিয়েছেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তিনি মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার জানান, হত্যার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় এবং পৃথক একটি দলকে ছায়া তদন্তে নিয়োজিত করা হয়। পিবিআই প্রধানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। মামলার অপর আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।’’
উল্লেখ্য, অভিযানে পিবিআই বরিশাল জেলা, পিবিআই সদর দপ্তর, নৌ পুলিশ এবং বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা সহযোগিতা করেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









