দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা অতিবৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটের কারণে কাঁচা মরিচের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে প্রথম চালান যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ করেছে। সরকারের অনুমতির পর সোমবার (৩ আগস্ট) রাত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রথম চালান দেশে প্রবেশ করে। তবে আমদানির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ শুরু হলেও শুল্ক, বন্দর ব্যয় ও কাস্টমস প্রক্রিয়া নিয়ে আমদানিকারকদের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে আমদানি ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সোমবার রাত ৮টার দিকে ভারতের একটি ট্রাকে ৯ হাজার ২০০ কেজি কাঁচা মরিচ বেনাপোল স্থলবন্দরে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর একই রাতে চালানটি ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। চালানটির আমদানিকারক শিমু এন্টারপ্রাইজ। খালাস কার্যক্রম পরিচালনা করে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান শিমু শিপিং লাইন্স।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক ট্রাফিক শামিম হোসেন বলেন, মরিচবাহী ট্রাক বন্দরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সীমান্তের ওপারে আরও কয়েকটি ট্রাক অপেক্ষায় রয়েছে। সেগুলো মঙ্গলবার বন্দরে প্রবেশ করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রথম ধাপে ৬৯ জন ব্যবসায়ীকে মোট ২৯ হাজার ৭১০ টন কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে নাসিক থেকে এসব মরিচ আমদানি করা হচ্ছে। সোমবার থেকেই আমদানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আমদানি সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতি টন কাঁচা মরিচের ঘোষিত আমদানি মূল্য ২৩ হাজার ৮৭৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজির ঘোষিত মূল্য প্রায় ২৪ টাকা। এর সঙ্গে সরকারকে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। সে হিসাবে ঘোষিত মূল্য ও শুল্ক মিলিয়ে প্রতি কেজির ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৯ টাকা। বন্দর, পরিবহন, খালাস, কাস্টমস, শ্রমিক মজুরি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত করলে কেজিপ্রতি ব্যয় প্রায় ৭৮ টাকায় পৌঁছানোর কথা। তবে বাস্তব ব্যয় আরও বেশি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আমদানিকারকরা।
আমদানিকারক শাহাজান বলেন, প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ আমদানিতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৩৫ টাকা। সামান্য লাভ রেখে বাজারে বিক্রি করা হবে। তিনি বলেন, আমদানি বাড়লে বাজারে মরিচের দাম কমে আসবে। তবে কাস্টমসের হয়রানি, পণ্য ছাড়করণে জটিলতা এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রকৃত আমদানি খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এতে অনেক আমদানিকারক লোকসানের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
হিসাব অনুযায়ী ঘোষিত আমদানি মূল্য ২৪ টাকা এবং শুল্ক প্রায় ৪৫ টাকা মিলিয়ে মোট ব্যয় ৬৯ টাকা হওয়ার কথা। বন্দর ও পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে তা প্রায় ৭৮ টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু আমদানিকারকের দাবি অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ ঘোষিত ব্যয়ের তুলনায় কেজিপ্রতি প্রায় ৫৭ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের দাবি করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের উৎস এবং বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যালোচনার দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল বন্দরের কাঁচাবাজারে সোমবার কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। সে হিসাবে আমদানিকারকের দাবি অনুযায়ী ১৩৫ টাকা ব্যয় হলেও খুচরা বাজারে দাম ছিল আরও ১৬৫ টাকা বেশি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত একাধিক ধাপে মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। তবে কার্যকর বাজার তদারকি জোরদার হলে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আমদানির অনুমতি দিলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। দ্রুত খালাস, স্বচ্ছ শুল্ক ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য তদারকি বাড়ানো গেলে আমদানির সুফল দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে কাঁচা মরিচের উচ্চমূল্যে সাধারণ ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকার আমদানির পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছে, দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য স্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









