সুনামগঞ্জের দুর্গম উপজেলাগুলো থেকে হামের উপসর্গ লালচে র্যাশ, প্রচণ্ড জ্বর আর শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে ছুটে আসছে একের পর এক শিশু। হাসপাতালের বারান্দা থেকে শুরু করে মেঝে কোথাও খালি নেই। একদিকে সিট না পেয়ে মেঝেতেই শিশুদের আকুতি, অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসা সামগ্রীর চরম সংকট রয়েছে বলে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসা সামগ্রীর কোনো সংকট নেই।
মঙ্গলবার (৪ জুলাই) পর্যন্ত ৯১ জন নতুন রোগী এসে যোগ হয়েছেন, যার মধ্যে ৮১ জনই শিশু আর ১০ জন কিশোর। জুলাই মাসেই রেকর্ড ৪৪৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগই দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দারা। বছরের পর বছর হাওরের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা আর যোগাযোগের দুর্গমতাকে জয় করে সময়মতো পৌঁছেনি টিকাদান কার্যক্রম। ফলে যে সুরক্ষাবলয় তৈরি হওয়ার কথা ছিল তাতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাঁক। স্বজনদের দাবি, টিকাদান কর্মসূচির সঠিক তথ্য ও সময়সূচি তারা পাননি।
হাম একটি চরম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা জরুরি। কিন্তু সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিত্র একদম উল্টো পৃথক কোনো আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় সুস্থ ও অন্য রোগীদের সাথেই মেঝেতে চাদর বিছিয়ে রাখা হচ্ছে হাম রোগীদের।
মেঝেতে শুয়ে থাকা তিন বছরের শিশুকন্যার পাশে বসে ক্ষোভ আর চোখে জল নিয়ে বাবা গোলাম আহমেদ বলেন, “গ্রামে টিকার কোনো খবর পাইনি। বাচ্চার গায়ে লাল দানা আর জ্বর দেখে ছুটছি সদরে। সিট পাই নাই, বারান্দায় চাদর বিছায়া রাখছি। ডাক্তার দিনে এক নজর আইয়া দেখে আর নার্সদের ডেকে ডেকে আনতে হয়। আর ওষুধ? স্যালাইন, ক্যানুলা থেকে শুরু করে সব বাহিরের দোকান থাইকা কিনে আনা লাগে।”
১০ বছরের শিশু হেপি আক্তারের মা লিপি বেগম জানান, “সোমবারে ভর্তি হইছি কিন্তু হাসপাতাল থেকে পাইছি শুধু একটু গ্যাস (নেবুলাইজার)। ইনজেকশন, ক্যানুলা, স্যালাইন, কসটিভ সব দোকান থেকে কেনা। বারান্দার ঠান্ডা মেঝেতে রোগী নিয়ে পড়ে আছি।”
রোগী ও স্বজনদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ড. আহম্মদ হোসেন বলেন, “সারা দেশে হামের প্রকোপ কমলেও আমাদের এখানে কমছে না। তবে আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিচ্ছি এবং দ্রুতই এটি নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধের পর্যাপ্ত সরকারি সরবরাহ আছে। যারা ওষুধ না পাওয়ার কথা বলছেন, তারা হয়ত ভুল বলছেন। এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’’
রোগ ছড়ানোর পেছনে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘হাম মারাত্মক ছোঁয়াচে। কিন্তু স্বজনরা হাসপাতালে একজন হামের রোগীকে দেখতে আসার সময় সাথে অন্য ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আসছেন। ফলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে এবং নতুন রোগী তৈরি হচ্ছে।’’
হাওরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে মহামারীর হাত থেকে বাঁচাতে এখনই মাঠপর্যায়ে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করা এবং জেলা হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পৃথক আইসোলেশন ইউনিট চালু করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









