১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে যে জমিদারবাড়িটি ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান দুর্গ ও আশ্রয়স্থল, স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পলেস্তারা খসে পড়ছে, আগাছায় ঢেকে গেছে চুন-সুরকির প্রাচীন দেয়াল। মুক্তিযুদ্ধের এই অনন্য স্মৃতিচিহ্নটি সরকারিভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ তো নেওয়া হয়ইনি, উল্টো জমিদারি ভূসম্পত্তি দখলের জন্য পাঁচতারা কষছে স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র, এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।
বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে অবস্থিত মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ‘কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী নাটু বাবুর জমিদারবাড়ি’।
১৬ শতকে প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই জমিদারবাড়ির পঞ্চম বংশধর ছিলেন কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু)। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর একজন জমিদারপুত্র হয়েও তিনি মুক্তিকামী জনতাকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। নিজের জমিদারির কোষাগার থেকে অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে জমিদারবাড়ি এবং পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ‘শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ এ গড়ে তোলেন তৎকালীন বাকেরগঞ্জের সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। এখানে বসেই চলত অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত পরিকল্পনা।
১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে এই বাড়িতে হঠাৎ আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। শুরু হয় তুমুল সম্মুখযুদ্ধ। সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ২১ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হলেও শহীদ হন ৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া উন্মাদ হয়ে পাকবাহিনী নির্বিচারে হত্যা করে ৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে।
মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য সংগঠক নাটু বাবু দেশ স্বাধীন হলেও বেশিদিন বাঁচতে পারেননি। স্বাধীনতার মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯৭৩ সালে স্থানীয় রাজাকার হাশেম আলী ও তার দোসররা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
৬ দশমিক ৬৯ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন জমিদারবাড়ির দোতলা মূল ভবনটি সংস্কারের অভাবে এখন চরম জরাজীর্ণ। প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে প্রাঙ্গণের বড় দিঘি, পুকুর ও বাগান সবকিছুতেই এখন অবহেলার ছাপ।
তবে এই পরিবারের দান করা ভূমির ওপরই গড়ে উঠেছে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামপুর বাজার, মসজিদ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এবং বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। দীর্ঘ ৯০ বছর পর ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নাটু বাবুর অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী নাটু বাবু মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ রাখা হয়।
যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িতে বসেই আমরা সুসংগঠিত হয়েছিলাম, যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। অথচ স্বাধীনতার এতদিন পরও সেই স্মৃতিচিহ্নটি আজ ধ্বংস হতে বসেছে। এটি সংরক্ষণ করা আমাদের বাকেরগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের দাবি।
নাটু বাবুর সহধর্মিণী ছায়া রায় চৌধুরী (বর্তমানে সন্তানদের সাথে বিদেশে অবস্থানরত) মুঠোফোনে আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, বাড়িটি সরকারিভাবে সংরক্ষণের জন্য আমরা সরকারি বহু দপ্তরে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কিন্তু কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাইনি। সরকার যদি এটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে, আমরা বাড়ি ও জমি পুরোপুরি সরকারের নামে দলিল করে দিতে প্রস্তুত আছি।
শ্যামপুর গ্রামের অধিবাসী মোস্তাক হোসেন বলেন, বহু দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই বাড়িটি দেখতে আসেন। যদি সরকারি উদ্যোগে জাদুঘর বা স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে এটিকে সংরক্ষণ করা না হয়, তবে ইতিহাস থেকে নাটু বাবু ও মুক্তিযুদ্ধের এই ঐতিহাসিক দুর্গটির নাম চিরতরে মুছে যাবে।
সার্বিক বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদারবাড়িটি আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। বাড়িটিকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কারের আওতায় আনার জন্য ইতোমধ্যে জেলা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









