সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে।
রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুরের এ ঘটনায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতের স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
নিহত ১৩ জনের প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর, ঋণ পরিশোধ বা একসময় দেশে ফিরে স্বজনদের নিয়ে স্বচ্ছন্দ জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। কেউ কেউ সেই স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু রিয়াদের আগুনে মুহূর্তেই থেমে গেল তাদের জীবন, অধরা রয়ে গেল স্বপ্নগুলো।
দুই ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার:
গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক ছিলেন সহোদর। দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ছেলেদের ছবি হাতে নিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বাবা গাফফার প্রামাণিক। সন্তান হারানোর শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা ময়না খাতুন।
ময়না খাতুন বলেন, ‘‘মৃত্যুর আগে মোহন তাকে মোবাইলে একটি অডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না।’ ছেলের সেই শেষ কথাই এখন বারবার তার কানে বাজছে।’’
ছেলের মরদেহ একবার দেখতে চান মা:
একই গ্রামের কলিমউদ্দিন প্রামাণিকও নিহত হয়েছেন ওই অগ্নিকাণ্ডে। প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা কারিমা বেগম।
কারিমা বেগম বলেন, ‘‘ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা মনে পড়লেই তার বুক ফেটে যায়। এখন তার একটাই ইচ্ছা ছেলের মরদেহ দেশে এনে একবার নিজের চোখে দেখা এবং পরিবারিক কবরস্থানে দাফন করা।’’
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করে দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল মোহনের। বাড়ির চারপাশে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী এখন সেই অপূর্ণ স্বপ্নেরই সাক্ষী।
১৪ দিনের মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো না বাবার:
রুবেল হোসেনের (৩০) মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর বাবা মোহাম্মদ সাইদুরের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে গন্ডগোহালী গ্রামের পরিবেশ।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘মাগরিবের আজানের পাঁচ-সাত মিনিট পর হঠাৎ একজন দৌড়ে এসে কইল, ‘মফতুল, তোর ব্যাটা নাকি ওইখানে মরে গেছে! কারখানায় আগুন লাগছে।’ কথাটা শুনে তখন আমি আর নিজের মধ্যে ছিলাম না। মনে হইছিল, দুনিয়ার থ্যানে আমি চলে গেছি।’’
সোমবার সকালে রুবেলের বাড়িতে দেখা যায়, স্বজনদের ভিড়। পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র ১৪ দিন আগে রুবেলের একটি কন্যাসন্তান জন্মেছে।
১৩ পরিবারে শোক:
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত ১৩ জন পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কাজ করছিলেন। আয় করা অর্থ দিয়ে কেউ সংসারের খরচ চালিয়েছেন, কেউ ঋণ পরিশোধ করেছেন, আবার কেউ দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন।
নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, নিহতদের মধ্যে কেউ কেউ সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অবস্থান করছিলেন। এ কারণে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হলে তা দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মরদেহ ফেরাতে যোগাযোগ:
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘‘নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’’
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।’’
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন—বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন (৩৫) ও চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭); কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) এবং বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫); পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮); বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর (৩১) ও মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪); উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২); আত্রাই উপজেলার মিনহাজ; বোয়ালা গ্রামের হৃদয় এবং নওগাঁ গ্রামের শাহিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









