দীর্ঘ তিন মাস ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত মধ্যরাত থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর নৌকা ও জাল নিয়ে হ্রদে নামতে শুরু করেছেন জেলেরা। মঙ্গলবার সকাল থেকেই মাছ আসতে শুরু করেছে রাঙামাটির বিভিন্ন ল্যান্ডিং ঘাটে। একই সঙ্গে চালু হয়েছে বরফকল, ব্যস্ততা বেড়েছে মাছ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের।
নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দফায় ধরা পড়া মাছের আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হ্রদের পানি কমতে শুরু করলে বড় আকারের মাছের সরবরাহ বাড়বে এবং তখন ব্যবসায়ও গতি ফিরবে।
রাঙামাটির চারটি ল্যান্ডিং ঘাটে মঙ্গলবার সকাল থেকেই জেলেদের নৌকা ভিড়তে দেখা যায়। মাছ নামানো, বাছাই, ওজন করা এবং বাজারজাতকরণ ঘিরে ঘাটগুলোতে তৈরি হয় ব্যস্ত পরিবেশ। মাছের সরবরাহ শুরু হওয়ায় শহরের বিভিন্ন বাজারেও বাড়তে শুরু করেছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা।
কাপ্তাই হ্রদের কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও পোনা মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়। এবারও মাছের প্রজনন, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি এবং হ্রদের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ২৪ এপ্রিল দিবাগত মধ্যরাত থেকে মাছ শিকার, বাজারজাতকরণ ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।
নির্ধারিত তিন মাস ১৫ দিন শেষ হওয়ার পর সোমবার মধ্যরাত থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হ্রদের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। দীর্ঘ সময় আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় মাছ আহরণ শুরু হওয়াকে তারা জীবিকা ফেরার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
কাপ্তাই হ্রদ বৃহত্তর ব্যবসায়ী সাধারণ সম্পাদক আব্দুল শুক্কুর বলেন, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা পর মাছ শিকার শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আবারও কাজে ফিরতে পেরেছেন। তবে প্রথম দিকে মাছের আকার ছোট হওয়ায় ব্যবসার খরচ ও লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যে মাছ আসছে তার সাইজ তুলনামূলক ছোট। এতে পরিবহন, বরফ, শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ তুলে আনা কঠিন হতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজার ভালো থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কয়েক দিনের মধ্যে মাছের আকার বড় হলে ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখতে পারবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাঙামাটি বিএফডিসির ব্যবস্থাপক (কমান্ডার) মো. ফয়েজ আল করিম জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর প্রথম দিনেই রাঙামাটি বিএফডিসির অবতরণ ঘাটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ এসেছে। জেলেরা স্বাচ্ছন্দ্যে মাছ আহরণ করছেন এবং ল্যান্ডিং কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে চলছে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে মাছের আকার কিছুটা ছোট হলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মাছের সাইজ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হ্রদে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় এখন বড় মাছ তুলনামূলক কম ধরা পড়ছে। পানি কমতে শুরু করলে বড় মাছের উপস্থিতিও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
বিএফডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে কাপ্তাই হ্রদ থেকে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে সেই পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন মাছ আহরণের সক্ষমতা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে কাপ্তাই হ্রদ থেকে উৎপাদিত মাছের সরবরাহ আরও বাড়বে এবং এর সঙ্গে জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, শ্রমিক, বরফকলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
মাছ ধরা শুরুর পর ইতোমধ্যে রাঙামাটির বাজারগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে কাপ্তাই হ্রদের মাছের আকার, বাজারদর এবং ঢাকাসহ দেশের প্রধান বাজারগুলোর চাহিদার ওপর আগামী দিনগুলোর ব্যবসা অনেকটাই নির্ভর করবে।
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ শুরু হওয়ায় একদিকে যেমন জেলেদের কর্মসংস্থান ফিরেছে, অন্যদিকে মৎস্যসম্পদের স্বাভাবিক প্রজনন ও বৃদ্ধির সুফল কতটা পাওয়া যাবে, সেটিও এখন দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় হ্রদে মাছের প্রজনন ও পোনা বৃদ্ধির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা আগামী মৌসুমে মাছের উৎপাদন বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









