মাদারীপুরের শিবচরে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তিকে পুলিশ থানায় নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মোজাম্মেল শিকদারকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর গভীর রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর আগে একই ধরনের ঘটনায় ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আঃ ছামাদ হাওলাদারকেও পুলিশ থানায় নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
মোজাম্মেল শিকদার কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম শিকদারের ছেলে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২২ নম্বর সদস্য। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও মামলা সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ মে শিবচর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা একটি মামলায় মোজাম্মেল শিকদারকে ৭৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগসহ তার বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব মামলার বর্তমান আইনি অবস্থান এবং তিনি কোনো মামলায় জামিনে আছেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যায়নি।
থানায় নেওয়ার পর গভীর রাতে মুক্তি ,স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৫ আগস্ট পুলিশ মোজাম্মেল শিকদারকে থানায় নিয়ে যায়। পরে গভীর রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে ছেড়ে দেওয়ার পেছনে শিবচর উপজেলা বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতার তদবির ছিল বলেও স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে ,কোনো ব্যক্তিকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে তাকে থানায় নেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী ছিল? আর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো?
পুলিশের বক্তব্যেই নতুন প্রশ্নঃ মোজাম্মেল শিকদারকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরে শিবচর থানার ওসি (তদন্ত) রাকিবুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মোজাম্মেল শিকদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এই বক্তব্যের পরই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ,কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো? কী কারণে তাকে থানায় নেওয়া হয়েছিল? জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছে? তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়টি যাচাই করা হয়েছিল কি না,এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আঃ ছামাদ হাওলাদারকেও নিয়ে একই অভিযোগঃ এর আগে ১৫ আগস্টকে সামনে রেখে শিবচর উপজেলার ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আঃ ছামাদ হাওলাদারকেও রাতে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পরে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও সংগঠনটির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
মামলা না থাকলে তাকে কী কারণে থানায় নেওয়া হয়েছিল এবং পরে কোন প্রক্রিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হলো এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
‘আইনি প্রক্রিয়া কোথায়?’প্রশ্ন স্থানীয়দের,শিবচরে পরপর এমন ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন 'কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার না করে শুধু থানায় এনে পরে ছেড়ে দেওয়ার কারণ কী?
আবার যার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাকে যদি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়, তাহলে তাকে থানায় নেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কাউকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়,মোজাম্মেল শিকদার ও আঃ ছামাদ হাওলাদারকে থানায় নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনেকেই বিষয়টির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করছেন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন 'আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তাহলে কাউকে রাতে থানায় নেওয়া এবং পরে গভীর রাতে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, সেটি জনগণের সামনে পরিষ্কার করা হবে কি না?
স্বচ্ছ তদন্তের দাবিঃ স্থানীয়দের দাবি, মোজাম্মেল শিকদারকে কেন থানায় নেওয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী, তাকে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং কার নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এসব বিষয় তদন্ত করে প্রকাশ করা হোক।
একই সঙ্গে আঃ ছামাদ হাওলাদারকে থানায় নেওয়ার কারণ, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ রয়েছে কি না এবং মামলা না থাকলে কী কারণে তাকে থানায় নেওয়া হয়েছিল । সেটিও স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
রাতে আটক, গভীর রাতে মুক্তি,পরপর এমন ঘটনায় এখন শিবচর পুলিশের ভূমিকা, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ’ এবং আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









