যমুনার ভাঙনকবলিত চরাঞ্চলে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরে গড়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমানা ঘেঁষে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কাইজার চরে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের উৎপাদনক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াট।
তীব্র গরমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে চাপ রয়েছে, তখন চরাঞ্চলের এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি।
প্রকল্পের অগ্রগতি
প্রকল্পের নাম ‘মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট’। শুরুতে এর উৎপাদনক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট নির্ধারণ করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১১০ মেগাওয়াট করা হয়। প্রায় ৩২৫ দশমিক ৬৫৩৬ একর জায়গাজুড়ে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নদীভাঙনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্প এলাকার চারপাশে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য বিপুলসংখ্যক খুঁটি বসানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় লাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি অংশের কাজ শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
অর্থসংকটে ধীরগতি
প্রকল্পের কাজ এগিয়ে গেলেও অর্থসংক্রান্ত জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বড় অঙ্কের বিল বকেয়া থাকায় অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে কিছু কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অর্থের সংস্থান নিশ্চিত হলে নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে।
পুনর্বাসিত পরিবার
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এর আওতাধীন এলাকার প্রায় ১০০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পুনর্বাসন এলাকায় পাকা বাড়ির পাশাপাশি বাজার, মসজিদ, ফার্মেসিসহ প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিনিয়োগ ১৩১.৫৬ মিলিয়ন ডলার
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি (সিআরইসি) এবং বাংলাদেশ সরকারের বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করছে। ২০২৩ সালের ১৩ জুন এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩১ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যৌথ উদ্যোগে সিআরইসির অংশ ৭০ শতাংশ এবং বিআর পাওয়ারজেনের অংশ ৩০ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দ্বিতীয় বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
১১০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে প্রকল্পটি চালু হলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। বর্তমানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সে হিসেবে মাদারগঞ্জের এই প্রকল্পটি দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পথে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা
প্রকল্প ঘিরে বগুড়া ও জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা। স্থানীয়দের আশা, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও বাড়বে।
প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক হুমায়ুন আকতার জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এলাকাবাসীর সহযোগিতা পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সবুজ জ্বালানির পথে নতুন সংযোজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। যমুনার চরাঞ্চলে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রটি উৎপাদনে গেলে জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের পরিধিও বাড়বে।
নদীভাঙন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত যমুনার চর এখন তাই শুধু ভাঙনের গল্প নয়—সেখানেই তৈরি হচ্ছে সবুজ বিদ্যুতের নতুন সম্ভাবনা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









