অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার আর এক কিশোরী বধূর করুণ আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। তবে সতীদাহ প্রথার বেদনাদায়ক স্মৃতি বিজড়িত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিক্রমপুর পোড়াগাছার রাজা কৃষ্ণ রাম সেনগুপ্ত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে জলাশয় ও বনভূমির বন্দোবস্ত নিয়ে এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার দুই ছেলে কৃষ্ণ কুমার সেনগুপ্ত ও দেবীচরণ সেনগুপ্তের জন্য দুটি পৃথক ভবন নির্মাণ করা হয়। এর একটি পরিচিতি লাভ করে দশ আনা বড় হিস্যা এবং অন্যটি ছয় আনা ছোট হিস্যা জমিদার বাড়ি নামে।
দেবীচরণ সেনগুপ্তের প্রপৌত্র ছিলেন কালী প্রসন্ন কুমার সেনগুপ্ত। ১৮২৮ সালে জমিদারিত্ব নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে মাত্র ২২ বছর বয়সে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যরা কালী প্রসন্ন কুমারের ১৬ বছর বয়সী স্ত্রী হরসুন্দরী দেবীর বিরুদ্ধে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। হরসুন্দরী বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও পরিবারের কেউ তা বিশ্বাস করেনি। অপবাদ ও অবিশ্বাসের যন্ত্রণা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন তিনি।
হরসুন্দরীর এই সহমরণের ঘটনা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পরপরই ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ শাসন আমলে আইন করে সতীদাহ প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এ অঞ্চলে হরসুন্দরীর পর আর কোনো সতীদাহের ঘটনা ঘটেছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় না।
কালের বিবর্তনে ছোট হিস্যা জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেলেও বড় হিস্যা’র কিছু অংশ এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে নাটমন্দির, হলঘর ও ছোট একটি মন্দির। বর্তমানে জমিদার বাড়ির চত্বরে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মূল অংশের একটিতে প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নাটমঞ্চ ও হলঘরে কমলিকন্দ নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জমিদার বাড়ির মূল ভবন ও দুর্গামন্দির লতাপাতা এবং ঝোপঝাড়ে ঢেকে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের অধিকাংশ দরজা-জানালা ভাঙা, দেয়ালের ইট ও প্লাস্টার খসে পড়ছে। বছরের পর বছর সংস্কার না করায় ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। এমনকি এটি যে একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি, সে পরিচয় বহনকারী কোনো সাইনবোর্ডও সেখানে নেই। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের মুখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হরসুন্দরীর সহমরণের চিতা স্থলটি ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করা হলেও বর্তমানে সেটিরও কোনো দেখভাল নেই।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা বিমল চন্দ্র দে বলেন, ‘‘কীর্তিপাশা জমিদার বাড়িটি কেবল ইটের স্তূপ নয়, এটি আমাদের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বিরাট অংশ। হরসুন্দরীর স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানটিতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসেন, কিন্তু জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে হতাশ হন। দ্রুত সংস্কার করা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম এই ইতিহাস ভুলতে বসবে।’’
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের ঝালকাঠি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা জানান, ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটি হিন্দু সম্প্রদায়ের আবেগ ও এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অবহেলায় এটি যেভাবে নষ্ট হচ্ছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। সরকার যেন দ্রুত এটিকে সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সাবেক বরিশাল ও খুলনা অঞ্চল) মো. মহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, ঝালকাঠি জেলায় এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালিত হয়নি। তবে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে দপ্তরের প্রতিনিধি পাঠিয়ে সরেজমিনে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জরিপ সম্পন্ন হলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুযায়ী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









