১৭ আগস্ট প্রিয় কবি টেড হিউজের জন্মদিন। ১৯৩০ সালের এই দিনে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মাইথলমরয়েডে জন্মেছিলেন বিশ শতকের অন্যতম শক্তিশালী ইংরেজ কবি টেড হিউজ। তার কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে বাজপাখি, কাক, শিয়াল, জাগুয়ার, বাতাস, বৃষ্টি, বন ও শিকার—প্রকৃতির এসব অনুষঙ্গ যেন মানুষের ভেতরের এক আদিম জগতের দরজা খুলে দেয়।
হিউজ নিজেই যেন তার কবিতার শিকড়ের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রাণী ও বন্য প্রকৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ কোনো পরিণত বয়সের সাহিত্যিক আবিষ্কার নয়; বরং শৈশব থেকেই তা তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরে গেঁথে ছিল।
পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের শিল্পাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত মুরল্যান্ডের মাঝখানে তাঁর শৈশব কেটেছে। একদিকে ছিল টেক্সটাইল মিল ও কারখানা, যেখানে প্রতিদিন মানুষ ঢুকে যেত; অন্যদিকে ছিল বিশাল, প্রায় জনশূন্য প্রান্তর। হিউজের নিজের ভাষায়, স্কুলে না থাকলে তিনি যেন এক ‘এমটি ওয়াল্ডনেস’-এর মধ্যে একা হয়ে যেতেন।
এই দুই জগতের সংঘাত—শিল্পসভ্যতা ও বন্য প্রকৃতি—পরবর্তী জীবনে তার কবিতার একটি গভীর ভিত তৈরি করে।
শৈশবে তাঁর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বন্য প্রাণী। বড় ভাইয়ের সঙ্গে তিনি শিকারে যেতেন, মাছ ধরতেন, পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতেন। বড় ভাই তাঁর শিকারের জগতকে উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ও প্রস্তরযুগের কল্পনার সঙ্গে মিশিয়ে দেখতেন। ছোট হিউজও সেই কল্পনার জগতে প্রবেশ করেছিলেন। পরে তিনি বলেছেন, সতেরো-আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত শিকার, মাছ ধরা ও প্রাণীদের প্রতি তাঁর আকর্ষণই ছিল জীবনের প্রধান অংশ—বইয়ের পাশাপাশি।
এই তথ্যটি হিউজের কবিতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর কাছে প্রাণী কখনো নিছক ‘নেচার পোয়েট্রি’-র বিষয় ছিল না। প্রাণী ছিল তাঁর অভিজ্ঞতার অংশ, শৈশবের স্মৃতি, কল্পনার জগৎ এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বোঝার একটি পথ।

হিউজ আট-নয় বছর বয়সে প্রচুর কমিক বই পড়তেন। তার বাবা-মায়ের সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের দোকান ছিল বলে এই বইগুলো তার নাগালের মধ্যেই ছিল। কিন্তু তার সাহিত্যিক কল্পনায় বড় পরিবর্তন আসে যখন মা তাকে একটি শিশুতোষ বিশ্বকোষ এনে দেন, যেখানে লোককথার অংশ ছিল। লোককথাগুলো পড়ে তিনি বিস্মিত হয়ে যান। এরপর লোকগল্প, ‘ফোকলর ও মিথলজি’ সংগ্রহ করা তার নেশায় পরিণত হয়।
কবিতা লেখার শুরু আগে প্রায় এগারো বছর বয়সে তিনি মজার ছড়া লিখতেন। কিন্তু চৌদ্দ বছর বয়সে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কবিতা পড়ে তার কবিতাবোধে বড় পরিবর্তন আসে। কিপলিংয়ের ছন্দ তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি কিপলিংয়ের ছন্দ অনুকরণ করে দীর্ঘ আখ্যানধর্মী কবিতা লিখতে শুরু করেন।
তার এক ইংরেজি শিক্ষিকার কাছ থেকে পাওয়া একটি ছোট প্রশংসাও তার জীবনে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষিকা তার একটি পংক্তি দেখে বলেছিলেন, ‘ইটস রিয়েলি পোয়েট্রি’। সেই মুহূর্তে হিউজ বুঝতে পারেন, কবিতা শুধু স্কুলের কাজ নয়; এটি তার জীবনের প্রধান আকাঙ্ক্ষা হতে পারে। ষোলো বছর বয়সেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন—তিনি কবি হতে চান।
হিউজের কবিতা শেখার পদ্ধতিও ছিল বিশেষ। তিনি যে কবিতা ভালোবাসতেন, তা মুখস্থ করতেন, অনুকরণ করতেন এবং উচ্চস্বরে পড়তেন। তার কাছে কবিতা কেবল চোখ দিয়ে পড়ার বিষয় ছিল না; কবিতার ছন্দ শরীর দিয়ে অনুভব করার বিষয়।
তিনি জঙ্গলে বসে স্পেনসার, মিল্টনসহ বহু কবির লেখা উচ্চস্বরে পড়তেন। ইয়েটস, ব্লেক, হপকিন্স ও এলিয়ট তার কবিচেতনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই তার নিজের ‘ক্যানন’ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
এখানেই পরবর্তী হিউজকে বোঝার একটি সূত্র পাওয়া যায়। তার কবিতার শব্দে যে শারীরিক শক্তি, ছন্দে যে গতি এবং উচ্চারণে যে আঘাত—তার পেছনে আছে কবিতা মুখস্থ করা ও উচ্চস্বরে পড়ার দীর্ঘ অভ্যাস।
একবার এক সাক্ষাৎকারে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল লেখার জন্য কি প্রয়োজন। উত্তরে হিউজ শুধু একটি বাক্যই বলেছিলে, শুধু একটি কলম’।
হিউজ হাতে লিখতেন। তার বিশ্বাস ছিল, হাতে লেখার মধ্যে মস্তিষ্ক ও হাতের একটি বিশেষ যোগাযোগ তৈরি হয়। টাইপরাইটারে সরাসরি লিখলে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, তার বাক্য অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়; উপবাক্য বাড়তে থাকে, চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুদের লেখা বিচার করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাতেও তিনি একই বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন। ওয়ার্ড প্রসেসর ব্যবহার করে লেখা দীর্ঘ রচনাগুলোতে ভাষা সাবলীল হলেও প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় বিস্তার দেখা যেত। তার ধারণা ছিল, হাতে লেখার স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিরোধ লেখাকে আরও সংক্ষিপ্ত, ঘন এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীর করে তুলতে পারে।
আজকের ডিজিটাল লেখালেখির যুগে হিউজের এই পর্যবেক্ষণ আরও আকর্ষণীয়। কলম বদলে গেছে কিবোর্ডে, কাগজ বদলে গেছে স্ক্রিনে; কিন্তু লেখকের শরীর ও ভাষার সম্পর্কের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।
হিউজের কাছে লেখার জন্য কোনো একটিমাত্র আদর্শ জায়গা ছিল না। হোটেলের ঘর, ট্রেনের কামরা, ছোট কুঠুরি—সব জায়গাতেই তিনি লিখেছেন। তার বই ‘ক্রো’-এর কয়েকটি কবিতা জার্মানিতে ভ্রমণের সময় লিখেছিলেন।
হিউজে মনে করতেন, সূক্ষ্ম বিভ্রান্তিই লেখকের বড় শত্রু। বস্টনে থাকার সময় এক বছর তিনি জানালার দৃশ্য ঢেকে রেখেছিলেন বাদামি কাগজ দিয়ে এবং কানে এয়ারপ্লাগ ব্যবহার করতেন। উদ্দেশ্য ছিল বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন রাখা।
ইংল্যান্ডে ফিরে একটি সিঁড়ির মাথায় ছোট্ট একটি ঘরও তিনি লেখার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। ঘরটি এত ছোট ছিল যে প্রায় একটি টেবিলের সমান। কিন্তু পরে নিজের লেখা দেখে তিনি বুঝেছিলেন, সেটিই তার জন্য ভালো লেখার জায়গা ছিল।
শিকার থেকে কবিতা, কবিতা থেকে পুরাণ
হিউজের সৃষ্টিশীল যাত্রাকে যদি একটি রেখায় আঁকা যায়, তা সম্ভবত এমন হবে-
শৈশবের বন্য প্রাণী → শিকার → লোককথা → ছন্দ → কবিতা → পুরাণ → মানুষের আদিম সত্তা।
১৯৭০ সালের ‘ক্রো’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাককে কেন্দ্র করে হিউজ এখানে এক অন্ধকার, পৌরাণিক এবং প্রায় মহাজাগতিক জগৎ নির্মাণ করেন। তার কাক কেবল একটি পাখি নয়; সে মানুষের বেঁচে থাকা, হিংসা, মৃত্যু ও সৃষ্টির ভাঙাচোরা ইতিহাসের এক অদ্ভুত প্রতীক।
হিউজকে শুধু ‘প্রকৃতির কবি’ বলা যথেষ্ট নয়। প্রকৃতি তার কবিতায় মানুষের ভিতরের অন্ধকারকে প্রকাশ করার ভাষা। টেড হিউজের জন্মদিনে তার কবিতা পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—কবির কবিতা তার শৈশবের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ ছিল না।
পাহাড়ি প্রান্তর, শিকারি ভাই, বন্য প্রাণী, লোককথা, কিপলিংয়ের ছন্দ, ইয়েটসের পুরাণ, ব্লেকের কল্পনা, হপকিন্সের শব্দশক্তি—সবকিছু ধীরে ধীরে তাঁর কবিতার শরীরে এসে মিশেছে। তাই হিউজের কবিতায় যখন একটি বাজপাখি উড়ে যায়, একটি কাক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে কিংবা বাতাস একটি বাড়িকে কাঁপিয়ে দেয়, তখন আমরা শুধু প্রকৃতিকে দেখি না। দেখতে পাই মানুষের বহু পুরোনো, প্রায় ভুলে যাওয়া এক সত্তাকে।
সভ্যতার বহু স্তরের নিচে যে বন্য প্রাণীটি এখনো বেঁচে আছে—টেড হিউজের কবিতা বারবার তারই মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের। আর হয়তো সেই কারণেই, জন্মের প্রায় এক শতাব্দী পরও, তার কবিতার ডাক এতটা কাঁচা, শারীরিক এবং জীবন্ত শোনায়।
হিউজের কাব্যিক আবির্ভাবের সময় ইংরেজি কবিতায় এক ধরনের সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত ও দৈনন্দিনতার দিকে ঝোঁক প্রবল ছিল। ফিলিপ লারকিন, কিংসলি অ্যামিস, ডোনাল্ড ডেভি প্রমুখের সঙ্গে যুক্ত ‘দ্য মুভমেন্ট’ কবিতায় আবেগের লাগাম, কথ্যভঙ্গি, সামাজিক বাস্তবতা এবং তীক্ষ্ণ বিদ্রূপকে গুরুত্ব দিয়েছিল। সেই পরিবেশে ১৯৫৭ সালে ‘দ্য হক ইন দ্য রেইন’ প্রকাশিত হলে হিউজের কবিতা যেন অন্য এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিল। সেখানে আবেগ সংযত নয়, প্রকৃতি শান্ত নয়, প্রাণী নিছক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। বরং সর্বত্র শক্তির সংঘর্ষ।
হিউজের তাৎপর্য বুঝতে লারকিনের সঙ্গে তার তুলনা করা যায়। লারকিনের কবিতায় আধুনিক মানুষ সময়, একঘেয়েমি, সামাজিক রীতি ও মৃত্যুচেতনার মধ্যে আটকে থাকে। তাঁর প্রধান উপকরণ বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণ ও বিদ্রূপ। হিউজের মানুষও বিপন্ন, কিন্তু তার বিপন্নতার উৎস আরও গভীরে—তার নিজের প্রাণীসত্তায়। লারকিন যেখানে আধুনিক মানুষের সামাজিক মুখটি দেখেন, হিউজ সেখানে তার মুখোশের নিচের প্রাণীটিকে দেখতে চান।

এই পার্থক্যের এক অসাধারণ উদাহরণ ‘দ্য থট-ফক্স’।
কবিতার শুরুতে কবি লিখছেন, ‘আই ইমাজি দিস মিডনাই মুমেন্টস ফরেস্ট’—মধ্যরাতের এক অন্ধকার বন তিনি কল্পনা করেন। কবি যেন নিজের ঘরে বসে আছেন; বাইরে নীরবতা। তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি শিয়াল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। প্রথমে তার উপস্থিতি অস্পষ্ট, পরে তার নড়াচড়া স্পষ্টতর হয়। শেষ পর্যন্ত শিয়ালটি কবির চিন্তার ভিতরে এসে পৌঁছায়।
শিয়ালটি একই সঙ্গে বাস্তব প্রাণী এবং কবিতার জন্মের প্রতীক। হিউজের কাছে কবিতা কোনো ঠান্ডা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা নয়; অন্ধকার অবচেতন থেকে উঠে আসা এক জীবন্ত প্রাণী। কবিতা যেন কবির কাছে ‘ভাবা’ কোনো বিষয় নয়, বরং ‘ঘটে যাওয়া’ একটি প্রাণশক্তি। এখানে হিউজের সঙ্গে আধুনিক কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। টি. এস. এলিয়টের কবিতায় আধুনিক মানুষের চেতনা, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উদ্ধৃতির মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হিউজ সেই বিচ্ছিন্ন চেতনাকে একটি প্রাণীর শরীর দেন। এলিয়ট-এর আধুনিকতার কেন্দ্রে যেখানে সভ্যতার ভাঙন, হিউজের কেন্দ্রে সেখানে সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম শক্তি।
এই প্রাণীসত্তাই ‘দ্য হক ইন দ্য রেইন’-এর কেন্দ্রে আরও প্রবল হয়ে ওঠে।
বৃষ্টিভেজা মাঠে মানুষের হাঁটা এবং আকাশে একটি বাজপাখির উড়ে যাওয়া—দৃশ্যটি আপাতদৃষ্টিতে সরল। কিন্তু হিউজ এই দৃশ্যকে পরিণত করেন শক্তি ও দুর্বলতার এক অস্তিত্ববাদী নাটকে। কবি কাদায় ডুবে যাচ্ছেন; অন্যদিকে বাজপাখি বাতাসের শক্তিকে ব্যবহার করে আকাশে উঠছে। মানুষ ও পাখি একই প্রকৃতির অংশ, অথচ প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এক নয়।
হিউজের কবিতায় শব্দ শুধু অর্থ বহন করে না; শব্দ নিজেই যেন একটি শারীরিক ঘটনা। ব্যঞ্জনধ্বনির ঘনত্ব, তিনি কাদার ভার, বৃষ্টির আঘাত ও প্রাণের সংগ্রামকে পাঠকের শরীরে অনুভব করান।
এই ভাষাগত বৈশিষ্ট্য হিউজকে তার অনেক সমসাময়িক কবির থেকে আলাদা করেছে। অডেনের কবিতায় যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ; লারকিনের কবিতায় কথ্যভঙ্গি; সিলভিয়া প্লাথের কবিতায় মানসিক অভিঘাত ও স্বীকারোক্তি। হিউজের ক্ষেত্রে শব্দ নিজেই যেন প্রাণী। তার মধ্যে রক্তের গতি আছে, পেশির টান আছে, আঘাত আছে।

হিউজের কবিতার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত প্রাণী-চরিত্রগুলোর একটি হলো ‘হক রোস্টিং’-এর বাজপাখি। এখানে কবি বাইরে থেকে বাজপাখি-কে দেখছেন না; বাজপাখি নিজেই কথা বলছে।
“I sit in the top of the wood, my eyes closed.”
এই বাজপাখি আত্মবিশ্বাসী, নির্মম, ক্ষমতাশালী। তার কাছে পৃথিবীর কোনো নৈতিক কেন্দ্র নেই। পৃথিবী তার শিকারক্ষেত্র। সে হত্যা করে, কারণ সে শিকারি। তার ক্ষমতার কোনো অনুশোচনা নেই।
কিন্তু এই বাজপাখি কি শুধু বাজপাখি?
হিউজের মৌলিকতা এখানেই যে প্রাণীটি একসঙ্গে বাস্তব এবং প্রতীকী। বাজপাখি প্রকৃতির শিকারী, আবার মানুষের ক্ষমতালিপ্সারও প্রতিরূপ। তাকে পড়া যায় রাজনৈতিক সহিংসতার রূপক হিসেবেও; পড়া যায় মানুষের ভিতরের আধিপত্যপ্রবণ প্রবৃত্তি হিসেবে।
অডেন যেখানে মানুষের রাজনৈতিক ও নৈতিক সমস্যাকে মানুষের ভাষায় বিশ্লেষণ করেন, হিউজ সেখানে একই সমস্যাকে একটি বাজপাখির কণ্ঠে উচ্চারণ করেন। অডেন সভ্যতার ভিতর থেকে মানুষকে দেখেন; হিউজ সভ্যতার মুখোশ খুলে মানুষকেশিকারী হিসেবে দেখেন।
টেড হিউজ শুধু ‘প্রকৃতির কবি’ নন। তিনি প্রকৃতির ভিতরে লুকিয়ে থাকা আধুনিক মানুষের কবি।
সভ্যতার আলো নিভে গেলে মানুষের ভিতরে যে অন্ধকার প্রাণীটি এখনও বেঁচে থাকে—হিউজ তারই ভাষা খুঁজেছেন। আর সেই ভাষা কখনো শিয়ালের পায়ের শব্দ, কখনো বাজপাখির চোখ, কখনো জাগুয়ারের অস্থির শরীর, কখনো ঝড়ের গর্জন, কখনো বা কাকের কালো ডানায় ফিরে আসে।
বিশ্বকবিতায় তার মৌলিকতা শেষ পর্যন্ত এখানেই—তিনি আধুনিক মানুষকে বোঝার জন্য আধুনিকতার বাইরের এক প্রাচীন, প্রাণময় ভাষা আবিষ্কার করেছিলেন। শব্দকে জীবন্ত সত্ত্বায় প্রাণ দিয়েছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









