সড়কের মাঝখানে একের পর এক গর্ত। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেসব গর্তে জমে পানি। কোথাও কাদা, কোথাও ভাঙাচোরা অংশ। গর্ত এড়িয়ে ধীরগতিতে চলছে অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন। যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে ঝাঁকুনি ও দুর্ভোগ, আর চালকদের গুনতে হচ্ছে গাড়ি মেরামতের বাড়তি খরচ।
এ চিত্র ময়মনসিংহের গৌরীপুর বাজার থেকে শালিহর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের। সড়কটির সংস্কারের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের এক বছরের বেশি পরও কাজ শেষ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে ও অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখায় চলাচলের দুর্ভোগ আগের চেয়ে আরো বেড়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে সড়কের খানাখন্দে পানি জমে যান চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও এলজিইডি কর্মকর্তারা কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে বৃষ্টি, বিটুমিন-সংকটসহ নানা কারণের কথা বলছেন। তবে কাজের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল কি না এ নিয়ে ঠিকাদার ও উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্যে পাওয়া গেছে অমিল।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কার্যাদেশ অনুযায়ী, গৌরীপুর উপজেলা সদর থেকে শালিহর অভিমুখী সড়কের ৪২২০ মিটার, অর্থাৎ প্রায় ৪ দশমিক ২২ কিলোমিটার অংশ সংস্কার কাজ পায় মেসার্স লিটন এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫১৬ টাকা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ২৪০ টাকা ২০ পয়সায়। কার্যাদেশে কাজ শুরুর তারিখ ছিল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এবং কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ৯ আগস্ট ২০২৫। কার্যাদেশে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সাত দিনের মধ্যে গৌরীপুর উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি নকশা, স্পেসিফিকেশন ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ করা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করার নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এক বছরের বেশি। এরপরও সড়কটির সংস্কারকাজ শেষ হয়নি।
সরেজমিন সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ দেখা গেছে। অনেক গর্তে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার উপরিভাগ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে যানবাহনকে গর্ত এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এতে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে, অনেক সময় তৈরি হয় যানজটও।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রবিন বলেন, ‘‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে দুই মিনিট বৃষ্টি হলেই কাদা হয়ে যায়। তখন হেঁটে চলারও উপায় থাকে না। পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা নেই। আমরা চাই দ্রুত কাজটা শেষ করা হোক। প্রায় ১০ বছর ধরে এ সড়কে অটোরিকশা চালান মো. আব্দুল লতিফ। তাঁর ভাষ্য, প্রায় তিন বছর ধরে সড়কটির অবস্থা খারাপ। খানাখন্দের কারণে প্রায়ই গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ যাত্রীদের কষ্ট হয়, বিশেষ করে রোগী নিয়ে যাতায়াত করতে খুব সমস্যা। খানাখন্দের কারণে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গাড়ির বিয়ারিং পাল্টাতে হয়, বিভিন্ন পার্টস নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের ভোগান্তি আর আমাদের ক্ষয়ক্ষতির কোনো শেষ নেই। অটোরিকশার যাত্রী ফরিদা বলেন, বহুদিন ধরে এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করছি। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। গাড়িতে গেলে শরীরে ব্যথা হয়ে যায়, মনে হয় হাড়গোড় ভেঙে যাবে। দ্রুত কাজটা শেষ হলে আমাদের সবারই সুবিধা হবে।’’
বাড়িয়ালাপাড়া এলাকার বাসিন্দা জিয়া বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা নষ্ট থাকায় সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি রিকশা ও অটোরিকশাচালকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রায় দুই বছর ধরে রাস্তার বিভিন্ন জায়গা কেটে বা খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। কাজ শেষ হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে চলাচলের সময়।’’
গাওগৌরীপুর এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘রাস্তার কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে। প্রতিদিন অটোরিকশা নষ্ট হচ্ছে, অসুস্থ রোগীদের যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। এক-দেড় বছর ধরে রাস্তা এভাবে পড়ে আছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করা হোক।’’
সড়কটির সংস্কারকাজে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে গৌরীপুর উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘‘গত মে মাসেই ঠিকাদার কার্পেটিংয়ের জন্য পাথর এনে রেখেছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ আন্তর্জাতিক কারণে দেশে বিটুমিনের সংকট তৈরি হওয়ায় কাজ এগোয়নি।’’
তিনি বলেন, ‘‘যে বিটুমিন আগে প্রায় ১১ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেটির দাম ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় উঠে যায়।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









