ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের জনজীবন। গ্রামাঞ্চলের কোথাও দিনে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। আবার কোথাও ১০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকার পরই চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। সিলেট নগরীতেও দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, কমছে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজের সময়। যন্ত্রনির্ভর কৃষিকাজেও এর প্রভাব পড়ছে।
সিলেটের গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীতে লোডশেডিং ও ভোল্টেজের ওঠানামায় শিল্পোৎপাদন নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। এতে একদিকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ভোল্টেজের ওঠানামায় যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে লোকসান বাড়ছে।
ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামা সামাল দিতে বিউবো সিলেটের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দিয়েছে বিসিক শিল্প মালিক সমিতি। চিঠিতে বলা হয়, গত পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম চললেও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানায় শিল্প মালিক সমিতি।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়ও ভোল্টেজের ব্যাপক ওঠানামা হচ্ছে। ৪২০ ভোল্টের জায়গায় তা কমে ৩০০ থেকে ৩৪০ ভোল্টে নেমে আসে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মেশিনের যন্ত্রাংশ পুড়ে যাচ্ছে।
একাধিক শিল্প উদ্যোক্তা জানান, এক ঘণ্টা ভোল্টেজ কম থাকলেও উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। বিদ্যুৎ না থাকলে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ থাকে। আবার ভোল্টেজের ওঠানামায় মেশিনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলতে থাকায় ব্যাংকঋণ পরিশোধ, সরকারকে নিয়মিত কর দেওয়া এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা আরও বলেন, জেনারেটরে অনেক মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। ফলে ওই মেশিনে কাজ থাকার দিনে বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।
তামাম পিভিসি ইন্ডাস্ট্রির প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোকাদ্দেস হোসেন বলেন, ‘ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের যে হারে ক্ষতি হচ্ছে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই আনুপাতিক হারে ক্ষতি হচ্ছে। তাই শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
বিসিক শিল্পনগরীর বেকারি কারখানাগুলোতে সাধারণত দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে কার্যকর উৎপাদন সময় নেমে এসেছে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায়। অর্থাৎ দিনের প্রায় অর্ধেক সময় কারখানার মেশিন বন্ধ থাকছে।
বিসিক শিল্প মালিক সমিতি সিলেটের সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এদিনকে বলেন, ‘আট ঘণ্টার বিপরীতে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। একে তো লোডশেডিং, তার মধ্যে ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এতে একদিকে ঠিকমতো মেশিন চালানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে মেশিন বিকল হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে মেশিন বিকল হয়ে তার প্রতিষ্ঠান আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তিনি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান। তার ভাষ্য, ‘এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কেউ আর ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসায় আসবে না।’
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগর ও আশপাশের শহরাঞ্চলে পিডিবির আওতায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। জেলা ও বিভিন্ন উপজেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় চাহিদা প্রায় ৩০৭ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে সিলেটে ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে পিডিবির আওতাধীন সিলেট অঞ্চলের দৈনিক হিসাব কিছুটা ভিন্ন। গতকাল মঙ্গলবার চাহিদা ছিল সর্বোচ্চ ২২৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ২২৫ মেগাওয়াট। সিলেট পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এদিনকে বলেন, ‘মঙ্গলবার কোনো ঘাটতি ছিলো না। পরিস্থিতি আগের তুলনায় এখন অনেকটা উন্নতি হচ্ছে বলে তিনি জানান।’
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুতের এই সংকট এখনই সমাধান করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান আরও বাড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









