তৃষ্ণা মেটাতে যশোর শহরের ফুটপাত ও ব্যস্ত সড়কের পাশে ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে লেবু, তোকমা ও ফলের শরবত। নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের কাছে কম দামের এসব পানীয় সহজলভ্য হলেও এর পানি, বরফ, গ্লাস ও উপকরণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরেজমিনে বিভিন্ন শরবতের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যবহৃত সাধারণ বরফই শরবতে দেওয়া হচ্ছে। শরবতের জন্য আলাদাভাবে খাবার উপযোগী বরফ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।
যশোর শহরের দড়াটানা, হাসপাতালের সামনে, চৌরাস্তা, মনিহার, রেলগেট, পালবাড়ি ও ক্যালেক্টরেট মার্কেটের সামনে ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের দোকানগুলোতে বড় পাত্রে শরবত তৈরি করা হচ্ছে। লেবু, চিনি, তোকমা, ফল ও বরফ অনেক ক্ষেত্রেই খোলা অবস্থায় রাখা। ব্যস্ত সড়কের ধুলাবালি ও যানবাহনের ধোঁয়ার মধ্যেই এসব উপকরণ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানে শরবত তৈরির পানি প্লাস্টিকের ড্রাম বা বালতিতে রাখা হচ্ছে। একই পানিতে একাধিক গ্লাস ধোয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
শরবতের দামের হিসাবেও বিষয়টি স্পষ্ট। একটি শরবতের দাম যদি গড়ে ১৫ টাকা ধরা হয়, তাহলে দিনে ৫০ গ্লাস বিক্রি করলে বিক্রেতার মোট বিক্রি ৭৫০ টাকা। ১০০ গ্লাস বিক্রি হলে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০০ গ্লাস বিক্রি হলে ৩ হাজার টাকা। এই বিক্রির বড় অংশই শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছ থেকে আসে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বরফ নিয়ে। বরফ কলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের উৎপাদিত বরফের প্রধান ব্যবহার মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে। শরবত বা পানীয়ের জন্য আলাদা বরফ উৎপাদনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। শহরের বড় বাজার এলাকার বরফ কলের কর্মী সাইদুল ইসলাম বলেন, তাদের এখানে মূলত মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বরফ তৈরি হয়। শরবতের জন্য আলাদা বরফ তৈরির ব্যবস্থা নেই। শরবত বিক্রেতাদের কেউ কেউ বাজার থেকে একই বরফ কিনে নিয়ে যান।
আরেক বরফ কলের কর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, বরফের প্রধান ক্রেতা মাছ ব্যবসায়ীরা। কোন ক্রেতা বরফ কী কাজে ব্যবহার করবেন, তা সবসময় জানা থাকে না। শরবতের দোকানেও একই ধরনের বরফ নেওয়া হয়।
দড়াটানা মোড়ে শরবত বিক্রেতা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তারা বাজার থেকে বরফ কিনে আনেন। শরবতের জন্য আলাদা বরফ পাওয়া যায় কি না, তা তাদের জানা নেই। বাজারে যে বরফ পাওয়া যায়, সেটিই ব্যবহার করেন। তিনি জানান, ক্রেতা শরবত পান করার পর গ্লাস ধুয়ে দেওয়া হয়। তবে গ্লাস ধোয়ার পানি কতবার পরিবর্তন করা হয়, তার নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
হাসপাতাল মোড় এলাকার শরবত বিক্রেতা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, তারা পানি ও বরফ কিনে শরবত তৈরি করেন। ক্রেতাদের সামনে শরবত তৈরি করা হয়। তবে খাবারের জন্য তৈরি বরফ এবং মাছ সংরক্ষণের জন্য তৈরি বরফ আলাদা করে চেনার সুযোগ তাদের নেই।
দড়াটানা এলাকার রিকশাচালক আবুল কালাম বলেন, কাজ করার সময় রাস্তার পাশে ১০ টাকার শরবত সহজে পাওয়া যায়। শরবত পরিষ্কার কি না, সবসময় পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয় না। একই কথা বলেন কোর্ট মোড় এলাকার শ্রমজীবী শরিফুল ইসলাম। তার মতে, ১০ থেকে ২০ টাকা দিয়ে শরবত কেনা সহজ হলেও অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. সেলিম রেজা বলেন, রাস্তার পাশ থেকে ১০ বা ২০ টাকার শরবত কোন কিছু না ভেবেই খেয়ে ফেলি। কিন্তু ওই পানীয় থেকে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস বা অন্য কোনো সংক্রমণ হলে চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধ ও যাতায়াত মিলিয়ে ব্যয় কয়েক হাজার টাকা হতে পারে। জটিল অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি শরবতের উপকরণেও রয়েছে অনিয়মের সুযোগ। লেবু, ফল, তোকমা ও চিনি খোলা অবস্থায় রাখলে ধুলাবালি ও জীবাণু মিশতে পারে। শরবতকে আকর্ষণীয় করতে অননুমোদিত রঙ ব্যবহার করা হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বরফের উৎস নয়, পানীয় তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই নিরাপদ কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যশোরের সাধারণ সম্পাদক শেখ মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, কম দামে শরবত বিক্রি হওয়া সমস্যা নয়, তবে সেটি নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। মাছ সংরক্ষণের জন্য তৈরি বরফ যদি শরবতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। নিরাপদ খাবার ও পানীয় পাওয়া নাগরিকের অধিকার।
তিনি বলেন, বিক্রেতাদের শুধু দায়ী করলে হবে না। তাদের নিরাপদ পানি ও খাবার উপযোগী বরফের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, দূষিত পানি, বরফ বা অপরিষ্কার গ্লাসের মাধ্যমে শরবত পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও জন্ডিসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি থাকে। খাবার বা পানীয় থেকে মানুষ অসুস্থ হলে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়ে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই ব্যয় বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, শরবত তৈরিতে নিরাপদ পানি ও খাবার উপযোগী বরফ ব্যবহার করা জরুরি। মাছ সংরক্ষণে ব্যবহৃত বরফ পানীয়তে ব্যবহার করা উচিত নয়। শরবতের উপকরণ ঢেকে রাখা, পরিষ্কার গ্লাস ব্যবহার এবং বিক্রেতার হাত পরিষ্কার রাখাও প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









