দেবতা, দানব, রাক্ষস, যুদ্ধ আর এক রাজপুত্রের দীর্ঘ যাত্রা—হাজার বছরের পুরোনো এক গল্প এবার হাজির হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল পর্দায়। ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রগুলোর একটি ‘রামায়ণ’ কি বিশ্ব সিনেমায় নতুন ইতিহাস তৈরি করতে পারবে?
মহাকাব্যের গল্প সিনেমায় নতুন নয়। গ্রিক কবি হোমারের দ্য অডিসি নিয়ে ক্রিস্টোফার নোলানের ছবি যেমন বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি এবার ভারতও তার অন্যতম প্রাচীন মহাকাব্য নিয়ে হাজির হচ্ছে বড় পর্দায়। আর সেই মহাকাব্য হলো রামায়ণ।
হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো এই গল্প এবার তৈরি হচ্ছে দুই পর্বে। প্রথম পর্ব মুক্তি পাওয়ার কথা আগামী নভেম্বরে, হিন্দুদের দীপাবলি উৎসবকে সামনে রেখে। ছবিটির বাজেটও চোখ কপালে তোলার মতো—প্রথম পর্বেই খরচ হচ্ছে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি ডলার। দ্বিতীয় পর্বের বাজেটও প্রায় একই। অর্থাৎ দুই ছবি মিলে এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোর একটি।
ছবিতে রামের চরিত্রে আছেন রণবীর কাপুর, আর রাবণের ভূমিকায় যশ। আন্তর্জাতিক পরিবেশনার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছে সনি পিকচার্স। সংগীতের সঙ্গে যুক্ত আছেন হলিউডের বিখ্যাত সুরকার হ্যান্স জিমার ও ভারতের এ আর রহমান। পরিচালনা করছেন নিতেশ তিওয়ারি।

সবার চেনা গল্প, নতুন করে
বাল্মীকি রচিত রামায়ণে রয়েছে প্রায় ২৪ হাজার শ্লোক। গল্পের কেন্দ্রে অযোধ্যার রাজপুত্র রাম। তাঁর স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করেন লঙ্কার রাজা রাবণ। এরপর সীতাকে উদ্ধারের জন্য রামের দীর্ঘ যাত্রা, বনবাস, হনুমান ও বানরবাহিনীর সহায়তা এবং রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিশাল মহাকাব্য।
ভারতে এই গল্পের পরিচিতি কতটা গভীর, তা বোঝাতে ছবিটির প্রযোজক নমিত মালহোত্রা বলেন, ভারতের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই দাদি-নানির মুখে রামায়ণের গল্প শুনে বড় হয়েছে শিশুরা।
রামায়ণ অবশ্য শুধু ভারতের গল্প নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এর নানা সংস্করণ রয়েছে। চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন ও টেলিভিশনে বহুবার এসেছে এই কাহিনি। ভারতের ১৯৮৭-৮৮ সালের ‘রামায়ণ’ টেলিভিশন সিরিজ তো একসময় দেশকে কার্যত থামিয়ে দিয়েছিল। প্রতি রোববার সিরিজটি দেখার জন্য মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকত।
ধর্মের বাইরে মানবিক গল্প
নিতেশ তিওয়ারির কাছে রামায়ণের সবচেয়ে বড় শক্তি ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং এর মানবিক আবেগ। তাঁর ভাষায়, এটি মূলত নৈতিকতা, সম্পর্ক, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও মানুষের আবেগের গল্প।
এই জায়গাটিই ছবির নির্মাতাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল সেট, যুদ্ধ, দেবতা ও দানবের দৃশ্য—সবকিছুর মাঝেও দর্শক যেন রাম, সীতা ও অন্য চরিত্রগুলোর আবেগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, সেটিই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিতে নতুন চমক
‘রামায়ণ’-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে এর ভিজ্যুয়াল এফেক্ট। ছবির পেছনে কাজ করছে ডিএনইজি—যে প্রতিষ্ঠান ওপেনহাইমার, ডুন ও ব্লেড রানার ২০৪৯-এর মতো সিনেমায় ভিজ্যুয়াল এফেক্ট তৈরি করেছে এবং একাধিক অস্কার জিতেছে।
আরও চমক রয়েছে ভাষায়। নির্মাতারা এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, যাতে অভিনেতাদের ঠোঁটের নড়াচড়া অনুবাদ করা ভাষার সংলাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়। ফলে ইংরেজি, স্প্যানিশ বা অন্য ভাষায় দেখলেও দর্শকের কাছে মনে হবে চরিত্রগুলো সেই ভাষাতেই কথা বলছে।

প্রযোজক নমিত মালহোত্রার লক্ষ্য পরিষ্কার—‘ভারত থেকে বিশ্বের জন্য’ একটি সিনেমা তৈরি করা।
ভারতীয় সিনেমা এরই মধ্যে আরআরআর ও অ্যানিমেল-এর মতো ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে জায়গা করে নিয়েছে। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই এবার রামায়ণকে শুধু ভারতীয় ছবি নয়, একটি বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র-ঘটনা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন নির্মাতারা।
নভেম্বরে প্রথম পর্ব মুক্তির পর বোঝা যাবে, হাজার বছরের পুরোনো এই গল্প আধুনিক বিশ্বের দর্শকের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিতে পারে। তবে একটি বিষয় এরই মধ্যে পরিষ্কার—রামায়ণ এবার শুধু গল্প হয়ে পর্দায় আসছে না, আসছে ভারতীয় সংস্কৃতির এক বিশাল বিশ্বযাত্রা হিসেবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









