ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে রাজশাহী নগরবাসীকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ নিলেও শুধু সরকারি বা সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম দিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কোথাও পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে নগর ভবনের সরিৎ দত্ত গুপ্ত সভাকক্ষে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে রাসিকের গঠিত কমিটির প্রথম সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি, মশা নিয়ন্ত্রণে ধোঁয়া ছিটানো, মশার উৎপত্তিস্থলে লার্ভা ধ্বংস এবং বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোনো পাত্র, ড্রাম, টব, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, আরও পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও ডেঙ্গুমুক্ত রাজশাহী মহানগরী গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজশাহী মহানগরীতে গত বছরের অভিজ্ঞতা বাড়াচ্ছে ডেঙ্গুর উদ্বেগ। ডেঙ্গুর ঝুঁকি যে শুধু মৌসুমি আশঙ্কা নয়, গত বছরের রোগীর পরিসংখ্যানেও তার প্রমাণ মিলেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডেঙ্গু মৌসুমে রোগীর সংখ্যা কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত বেড়ে যায়। ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলতি মৌসুমে রামেক হাসপাতালে ১ হাজার ৪০৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৪৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় হাসপাতালে আরও ৪১ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এর আগে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিল ৮১৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৭৬৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন এবং ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী রাজশাহী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ২০২৫ সালের জুনেই রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ২৫ জুন পর্যন্ত ৭৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জুনের শেষ দিকে আরও একজন নারী ডেঙ্গুতে মারা যান।
রাজশাহীর জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হলো ডেঙ্গুর স্থানীয় সংক্রমণ। গত বছর রাজশাহী নগরীর কয়েকটি এলাকায় পরিচালিত কীটতাত্ত্বিক জরিপে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, নগরীর পাঁচটি ওয়ার্ডে ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। একই প্রতিবেদনে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের ৯৭ শতাংশ স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সভায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন কমিটির সদস্যসচিব ও রাসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএএম আঞ্জুমান আরা বেগম। সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কয়েকটি কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নগরজুড়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা; এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস করা; প্রয়োজন অনুযায়ী মশক নিধনে ধোঁয়া ছিটানো; বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা; বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন স্থাপনায় জমে থাকা পানি অপসারণে নজরদারি; বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা; ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সংক্রমণের উৎস অনুসন্ধান করা।
রাসিক প্রশাসকও নগরবাসীকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তবে নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া এ উদ্যোগ টেকসই ফল দেবে না।
সভায় রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, সচিব সোহেল রানা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুল হাসান খান মুক্ত, বিভাগীয় পরিচালক স্বাস্থ্য কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. রোজী আরা খাতুন, রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি রাজশাহী সিটি ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. শামীম হোসেন চৌধুরী, এনজিও প্রতিনিধি খাজা তারেক, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিনিধি ডা. মো. শাকিল আহমেদ এবং রাসিকের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









