দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ ও আবাসন সংকট নিরসনের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, নারী-শিশুর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং ক্যাম্প থেকে মাদক নির্মূলে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন স্ট্যান্ডেড পিপলস জেনারেল রিহ্যাবিলিটেশন কমিটি (এসপিজিআরসি)-এর নেতারা।
রবিবার (৩০ আগস্ট) নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির তিন দিনব্যাপি কাউন্সিলের শেষ অধিবেশনে এসব দাবি তুলে ধরেন নেতারা। তিন দিনব্যাপী এ কাউন্সিলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৭০টি ক্যাম্পের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এর আগে গত ২৫ আগস্ট এসপিজিআরসির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও নেতা মরহুম আলহাজ্ব এম. নাসিম খানের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে কাউন্সিলের কার্যক্রম শুরু হয়।
কাউন্সিলের শেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এসপিজিআরসি সৈয়দপুর শাখার সভাপতি রিয়াজ আকবর। বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাজী এম. শওকত আলী, সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন অর রশিদ, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সমাজকর্মী সোহেল আকতার খান, হুমায়ুন জাফর, হুমায়ুন কবির, প্রশাসনিক সম্পাদক নুর ইসলাম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম ভলু, কোষাধ্যক্ষ আফতাব আত্তারী, বার্তা সম্পাদক সামশাদ শাকিল, দপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান, ক্রীড়া সম্পাদক মাসুদ রানা ছোটু, আইন সম্পাদক আইয়ুব আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক খুরশীদ আলম, সাংবাদিক নওশাদ আনসারীসহ বিভিন্ন জেলার ক্যাম্পের নেতৃবৃন্দ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত জং সানডে ম্যাগাজিন-এর সাব-এডিটর মো. হুমায়ুন জাফরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা।
বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছে। সংকীর্ণ জায়গায় একাধিক প্রজন্মের মানুষের বসবাস, পর্যাপ্ত আবাসন ও নাগরিক সুবিধার অভাবসহ নানা সমস্যায় তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে বিহারী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নাগরিকত্ব প্রদান বা স্বীকৃতি দিলেই হবে না; শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
কাউন্সিলে ক্যাম্প থেকে মাদক নির্মূলে প্রশাসনের জোরালো পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের একটি অংশকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে অপবাদ দেওয়া হয়। অথচ ক্যাম্পের ভেতর থেকে যারা মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

এ সময় ক্যাম্প উচ্ছেদ বন্ধ রাখা, আবাসন সংকট নিরসন, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, নারী ও শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং তরুণদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দাবিও তুলে ধরা হয়।
এসপিজিআরসির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, এই কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। তারা অবহেলিত বিহারী জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরবে।
তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্যতম অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারীরা বছরের পর বছর সংকটের মধ্যে রয়েছেন। কয়েক ফুট জায়গার মধ্যে তিন প্রজন্মের মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে। একই ছোট ঘরে রান্না, গোসল ও পালাক্রমে ঘুমানোর মতো পরিস্থিতিও রয়েছে অনেক পরিবারের। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, ক্যাম্পবাসীর জীবনমান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
এসপিজিআরসি সৈয়দপুর শাখার সভাপতি রিয়াজ আকবর বলেন, ‘এবার ঢাকার পরিবর্তে সৈয়দপুরে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ায় আমরা গর্বিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্যাম্প থেকে নেতৃবৃন্দ সৈয়দপুরে এসেছেন। তাদের পদচারণায় শহরটি মুখরিত হয়েছে। তিনি বলেন, সম্মিলিতভাবে বিহারীদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। শুধু নাগরিক করলেই হবে না, নাগরিকের অধিকারও দিতে হবে।’
এর আগে কাউন্সিলের প্রথম দিন মরহুম আলহাজ্ব এম. নাসিম খানের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম, সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিন আকতার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন পাপ্পু, উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির শফিকুল ইসলাম, শহর আমির শরফুদ্দিন খান, এনসিপির মনজুর আলম, জাভেদ আত্তারীসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীরও অবদান রয়েছে। তাই তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলমান আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
উল্লেখ্য, এসপিজিআরসির সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর শাখা রয়েছে। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি ও অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









