## উৎপাদনে রেকর্ড হলেও দামে ধস, পয়লা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ঘিরে হতাশ ব্যবসায়ীরা
বাজারের দিকে। কিন্তু তার আগেই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান। এই মাসে সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান কমে যায়, ফলে ফুলের চাহিদাও কমে। অনেকের আশঙ্কা, যদি একুশের বাজারও প্রত্যাশা পূরণ না করে, তাহলে বিক্রি ৫০ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গদখালী শুধু বাজারই নয়, এটি সমন্বিত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। এখানে রয়েছে- চাষি, নার্সারি মালিক, শ্রমিক, পরিবহন ও পাইকারি ব্যবসায়ী এবং খুচরা বিক্রেতা, পর্যটন ও বিনোদন খাত। এই পুরো চক্রে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। বাজারে প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় বেচাকেনা। দুই হাজারেরও বেশি চাষি বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান আর ছোট ট্রাকে করে ফুল নিয়ে এসে এখানে পসরা সাজান। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইলসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে ফুল কিনে নিয়ে যান বাসের ছাদে, পিকআপে কিংবা মাইক্রোবাসে করে।
গদখালীর বাজার মানেই তাই গোলাপের ঝুড়ি, গাঁদার বস্তা, জারবেরার বাক্স, রজনীগন্ধার আঁটি সব মিলিয়ে এক রঙিন জনপদ।
সরেজমিন দেখা গেছে, এবার ভরা মৌসুমেও দরদামের টানাপড়েন থামছেই না। মানভেদে গোলাপ ৮ থেকে ১২ টাকা, গ্লাডিওলাস ৬ থেকে ১২ টাকা, রজনীগন্ধা ৩ থেকে ৬ টাকা, জারবেরা ১০ থেকে ১৮ টাকা, জিপসি ফুল প্রতিমুঠো ২০ টাকা ও কামিনী পাতা প্রতিমুঠো ৫০ টাকা এবং গাঁদাপ্রতি হাজার ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হতাশ অনেক চাষির দাবি, এই দামে উৎপাদন খরচই ওঠে না।
উপজেলার টাওরা গ্রামের মিলন হোসেন ও গদখালী গ্রামের নুর আলম ৮০০টি করে লাল গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন। তাদের ভাষ্য, ‘এ বছর গোলাপের বাজার ভালো না। সাত-আট টাকার বেশি কেউ গোলাপের দাম বলছে না। এই দামে খরচও উঠছে না।’ পাটুয়াপাড়া গ্রামের মনিরুল ইসলাম বাবু জানান, গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক কম। ৩৬ শতক জমিতে গোলাপ চাষ করে সকালে তিন হাজার ফুল নিয়ে বাজারে এসেছেন। ক্যাপ পরানো গোলাপ পাঁচ টাকা, আর লাল গোলাপ সাড়ে ১১ টাকায় বিক্রি করে তিনি হতাশ।
আরেক চাষি জালাল উদ্দিন বলেন, এক লাখেরও বেশি টাকা খরচ করে চাষ করেছেন, কিন্তু বাজারে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ৪২ শতক জমিতে গোলাপ করেছি। এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ। আজ তিন হাজার গোলাপ সাড়ে তিন টাকায় বিক্রি হয়েছে। সার দোকানের বকেয়া শোধ করতে পারছি না।হতাশাজনক এ পরিস্থিতির পেছনে নির্বাচন ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকেই দায়ী করছেন সবাই। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে গত কয়েকদিন গদখালীর পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়। বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসের মৌসুমে পর্যটক কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রনী খাতুন বলেন, ‘নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাময়িকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।’
কৃষি বিভাগ জানায়, যশোর অঞ্চলে প্রায় সাত হাজার চাষি এবার ৬৪১ হেক্টর জমিতে ১৩ প্রজাতির ফুল চাষ করেছেন। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ ফুল আসে এই অঞ্চল থেকে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিশেষ করে গোলাপ ও গ্লাডিওলাসের উৎপাদন বেশি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে আর সেই চাপ গিয়ে পড়েছে দামে। তাদের মতে, উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে এবার দাম কমায় ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোকসানের সম্মুখীন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সমরেন সাহা বলেন, এখন ভরা মৌসুম। উৎপাদন বেশি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। দু-একদিন পরে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
অধিকাংশ চাষিই বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কমে গেছে। এক বিঘা (৩৩ শতক) গোলাপ চাষে প্রাথমিক খরচ প্রায় দেড় লাখ টাকা। রোপণের তিন মাস পর থেকে ফুল কাটা যায় এবং একবার রোপণ করলে ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। তবে মাসিক সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ তিন থেকে চার হাজার টাকা। চাষিরা জানান, শীতের তিন মাসই মূল ভরা মৌসুম। এই সময়ের আয়ে নির্ভর করেই বছরের বাকি সময় পার করতে হয়। এবারের দরপতন সেই ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের মতে, উৎপাদনে রেকর্ড গড়েও যদি তারা ন্যায্য দাম না পান, তবে সেই সাফল্যের কোনো অর্থ থাকে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক পরিবার সারা বছরের পরিকল্পনা সাজান এই সময়ের আয়ে ভিত্তি করে। কিন্তু সাতদিনের নিষেধাজ্ঞায় বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে। গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ছিল ১১০ থেকে ১১৫ কোটি টাকার বিক্রি। অর্ডার ভালো এসেছে। কিন্তু বাজারের অনিশ্চয়তায় সেটি হলো না।’
এদিকে যশোরের নির্বাচনি সমাবেশে গদখালীর ফুল বিশ্ববাজারে রপ্তানির ঘোষণা দিয়েছিলেন নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই ঘোষণা চাষিদের মধ্যে নতুন আশা হয়ে এসেছে। তাদের মতে, দেশি বাজার মৌসুমি হওয়ায় উৎপাদন বাড়লেই দাম পড়ে যায়। নিয়মিত রপ্তানি শুরু হলে অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ কমবে এবং দাম স্থিতিশীল থাকবে।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান সম্প্রতি ফুলচাষিদের আশার আলো জুগিয়েছেন। তিনি জানান, কাপড় শিল্পের মতোই গদখালীর ফুল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির সুযোগ করে দেবেন। ফলে গদখালীর ফুল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন রপ্তানির ওই নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
আবদুর রহিম বলেন, ‘আমরা কথার ফুলঝুরি চাই না, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাই। এতে ফুলচাষিরা লাভবান হবেন।’ তার আশা, দ্রুত কোল্ড চেইন, আধুনিক সংরক্ষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও সহজ কার্গো সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। গদখালীর চাষিরাও তাকিয়ে আছেন রপ্তানির ঘোষণাটি বাস্তবায়নের দিকে। তাদের দাবি স্পষ্ট, ‘প্রতিশ্রুতি নয়, চাই কার্যকর পদক্ষেপ।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









