দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি পাঠালো নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের মানুষ। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর এই জনপদে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। এবারে নীলফামারী-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ২২২ ভোট পেয়ে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন।
স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এবং পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী কখনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল সেই ধারায় প্রথম বড় ব্যতিক্রম তৈরি করেছে।
অতীতে দেখা গেছে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৪ আসনে জয়ী হন জাতীয় আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রার্থী এম. আবদুল হাফিজ। এরপর বিভিন্ন নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই আসনের প্রতিনিধিত্বও পরিবর্তিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হলেও রাজনৈতিক সংকটের কারণে ওই সংসদের মেয়াদ স্বল্পস্থায়ী হয়। একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আসাদুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ধারাবাহিকভাবে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আমজাদ হোসেন সরকার জয় লাভ করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ. এ. মারুফ সাকলাইন বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ সীমিত থাকলেও জাতীয় পার্টির শওকত চৌধুরী নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন জাতীয় পার্টির আহসান আদেলুর রহমান। এরপর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন আলহাজ্ব সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একাধিক নির্বাচনে এই জনপদে প্রার্থী দিলেও তারা কখনো বিজয়ের মুখ দেখেনি। কারন সৈয়দপুর শহর অবাঙালি অধুষ্যিত এলাকা হওয়ায় তারা বরাবরই ছিল জামায়াত বিমুখ। এবং তাদের মনে করা হত বিএনপির ভোট ব্যাংক। তবে দলটির একটি স্থায়ী ভোটভিত্তি এলাকায় সক্রিয় ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
তবে এবার ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৪ আসনে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম এই জনপদের অবাঙালিদের আস্থা অর্জন করেন এবং প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ২২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার পান প্রায় ৮২ হাজার ৮৬ ভোট। ভোটের ব্যবধান ও জনসমর্থনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি ছিল আসনটির ইতিহাসে অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন।
১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের ভোটের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- প্রথমদিকে ভোটের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও ২০০৮ সালের পর থেকে বড় দলগুলোর ভোটসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালে জামায়াত প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট এই আসনে তাদের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভোটারদের আচরণে পরিবর্তন, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ-সব মিলিয়ে জামায়াতের এই বিজয় সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সৈয়দপুরের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম জামায়াতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যেও নতুন করে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের আলোচনা শুরু হয়েছে।
দীর্ঘ তিন দশকের নির্বাচনী ইতিহাস পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের ফলাফল এখন নীলফামারীর সৈয়দপুরে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু-যেখানে একটি আসন নয়, বরং একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ও আরেকটির সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে এই বিজয়কে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত মনোনীত বিজয়ী প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম বলেন, এই বিজয় কোনো ব্যক্তি বা দলের একার নয়, এটি সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের বিজয়। আমাকে যারা ভোট দিয়েছেন, আর যারা দেননি-সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই। দল-মত নির্বিশেষে এলাকার উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথমবার এই এলাকার মানুষ জামায়াতকে সংসদে পাঠানোর যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা আমি আমানত হিসেবে দেখছি। আমরা জাতির শাসক না সেবক হতে চাই। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চাই।
কাওছার আল হাবীব/এদিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









