সিলেটের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম অর্থনৈতিক জোন তামাবিল স্থলবন্দরের প্রধান সড়ক এখন প্রভাবশালী চক্রের অবৈধ ডাম্পিং ইয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে প্রতিদিন আমদানি করা শত শত টন পাথর কোনো প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ঢেলে রাখা হচ্ছে মহাসড়কের ওপর এবং এর ঠিক ধার ঘেঁষে। ফলে দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্র জাফলং ও তামাবিলে আসা হাজার হাজার পর্যটক, পণ্যবাহী যানবাহন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। তীব্র যানজটের পাশাপাশি এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকৃত এই বিশাল পাথরের স্তূপ ট্রাকে লোড-আনলোড করার জন্য প্রতিদিন শত শত মালবাহী ও বড় বড় ড্রাম ট্রাক মূল সড়কের ওপরই দীর্ঘ সময় ধরে পার্কিং করে রাখা হয়। পণ্যবাহী এসব ভারী যানবাহন দুই লেনের এই আন্তর্জাতিক মহাসড়কের অধিকাংশ অংশ দখল করে রাখায় সড়কটি সংকুচিত হয়ে কার্যত এক লেনে পরিণত হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন জাফলংগামী পর্যটকবাহী বাস, মাইক্রোবাস ও সাধারণ মানুষের যানবাহনগুলো তীব্র যানজটের কবলে পড়ে আটকে থাকছে।
সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে। গোয়াইনঘাট উপজেলাসহ সীমান্তের এক বিশাল অংশের সাধারণ মানুষকে জরুরি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন জৈন্তাপুর ও বিভাগীয় শহর সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়। কিন্তু অবৈধ পার্কিং ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের কারণে সৃষ্ট তীব্র জটলার কারণে অনেক সময় মুমূর্ষু ও প্রসূতি রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স জ্যামে আটকে থাকে। এতে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর জীবন সংকটের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সচেতন মহল, পর্যটক ও এলাকাবাসীর দাবি, দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব উৎপাদনকারী তামাবিল স্থলবন্দর ও পর্যটনকেন্দ্র জাফলং অঞ্চলের প্রধান সড়কটি এখন অবৈধ পাথরের স্তূপ ও যত্রতত্র ট্রাক পার্কিংয়ের দখলে চলে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় মহাসড়কটি ব্যক্তিগত ব্যবসার ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করায় প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তি ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের সাময়িক উচ্ছেদ অভিযানে কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
অবিলম্বে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এই অবৈধ দখল ও পার্কিং উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। অন্যথায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের গতি থমকে যাবে এবং ধস নামবে জাফলংয়ের পর্যটন শিল্পে। জনস্বার্থে মহাসড়কটি দ্রুত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপের জোর দাবি জানাচ্ছি।
যোগাযোগ করা হলে তামাবিল পাথর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি রফিকুল ইসলাম শাহপরান বলেন, স্থলবন্দরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা সড়কের পাশে পাথর আনলোড করছেন। তবে মূল সড়ক যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আমাদের কাম্য নয়। বন্দর অভ্যন্তরে জায়গা কম থাকায় আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে 'কানাইজুড়ি ডাম্পিং' চালুর প্রস্তাব করেছি। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ডের জন্য আমরা যৌথভাবে চেষ্টা চালাচ্ছি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, মহাসড়কের পাশে পাথর স্তূপ করা এবং অবৈধভাবে ট্রাক পার্কিং করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তামাবিল-জাফলং সড়কটি সচল ও নিরাপদ রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে খুব দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। সড়ক দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, সড়কের পাশের সরকারি যায়গা দখল করে ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। মহাসড়ককে যানজট ও দুর্ঘটনামুক্ত করতে দ্রুতই সড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা ও পাথরের স্তূপ সরিয়ে নিতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









