গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে দিনে দুপুরে এক অসহায় বর্গাচাষীর স্বপ্ন ও জীবিকার ওপর নির্মম আঘাত হানা হয়েছে। এতে ওই হতদরিদ্র কৃষক ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার কাটাবাড়ি ইউনিয়নের কুঠিয়াবাড়ি গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক লেবু মিয়া এ ঘটনায় রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লেবু মিয়া পেশায় একজন অটো চালক। অটো চালানোর পাশাপাশি সংসারের টানাপোড়েনের মাঝেও বছরের পর বছর ধরে অটো চালিয়ে একটু একটু করে টাকা জমান। আর সেই জমানো টাকাসহ ধারদেনা করে, কয়েকমাস আগে আদিবাসী আনসেল ও থমাস হেব্রন কাছ থেকে ১ বছরের জন্য ৭০ হাজার টাকা চুক্তিতে তিনি বাগদা ফার্মের ৭ বিঘা জমি বর্গা নেন। এরপরে সেই জমিতে শুরু করেন আলু ও ভুট্রা চাষ। প্রতিদিন অটো চালানোর পাশাপাশি করেন ফসলের পরিচর্যা। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই বাড়ির পাশের জমি থেকে আলু তুলবেন। আর সেই আলু বাজারে বিক্রি করে কিছুটা ধারদেনা পরিশোধ করবেন৷ এদিকে তার বর্গা নেওয়া অন্যান্য জমিগুলোতে ভুট্রা গাছে উঁকি দিয়েছে সবুজ ফুল।
ঘটনার দিন লেবু মিয়ার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বর্গা নেওয়া অপর একটি জমিতে ধানের চারা রোপন করতে গিয়ে বাধে চরম বিপত্তি। সকালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী জমির অপর চাষীর সাথে গন্ডগোলের জের ধরে দুপুরে আনসেল ও তার ছেলে শীতলসহ ২৫ থেকে ৩০ জন আদিবাসী মিলে বর্গাচাষী লেবুর আলু, ভুট্টা ও রোপনকৃত ধানের জমিতে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ দিতে গেলে লেবু মিয়া ও তার স্ত্রী শেফালী বেগম বাধা দিতে গেলে তাদের মারধর করে। কৃষক দম্পতির চোখের সামনেই ঘটে নিজেদের চরম সর্বনাশ। আনসেলের নির্দেশে ট্রাক্টর চালিয়ে সকল ফসল নষ্ট করা হয়।
এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক লেবু মিয়া। ফসলের শোকে তিনি বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন জমির আইলে। স্বামীর এই করুন অবস্থা দেখে অসহায়ের মত কেঁদে যাচ্ছেন তার স্ত্রী। পরে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক লেবু মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে ৭ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করি। আজ (শনিবার) সকালে আমার জমিতে কামলারা ধান লাগাতে গিয়ে ভুল করে অন্যের ১০ শতক জমিতে ধান লাগায়। আমি ওই জমি মালিককে ধানসহ জমি ছেড়ে দিলেও তিনি আমার বাবা-মা তুলে গালিগালাজ করে। এতে সেখানে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হলে সংগঠনের সদস্যরা এসে আমার আলু, ভুট্টা ও ধানের জমি ট্রাক্টর দিয়ে নষ্ট করে দেয়। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমাদের মাঝে ঝগড়া হয়েছে তার বিচার হবে, তাই বলে কেন আমার ফসল নষ্ট করবে?
লেবু মিয়ার স্ত্রী শেফালী বেগম বিচলিত কন্ঠে বলেন, আমার স্বামী বিভিন্ন জায়গা থেকে ৩ লাখ টাকা লাভের উপরে নিয়ে চাষবাস শুরু করেছিল। আজ আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমাদের আর কিছুই রইলো না। এখন আমরা কিভাবে এই টাকা শোধ দিবো?
এলাকাবাসী এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা শুধু ফসল নষ্ট করার ঘটনা নয়, এটি লেবু মিয়ার জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, কৃষকের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কাওছার আল হাবীব/এদিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









