পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামটি পায়রা নদীর অব্যাহত ভাঙনে এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। তীব্র নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শত শত মানুষ। বাধ্য হয়ে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি রাস্তার ওপরে, কাটাচ্ছেন চরম মানবেতর জীবন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পায়রা নদীর করাল গ্রাসে এ পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আংগারিয়া ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিনশ একর জমি। বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে দেড়শতাধিক পরিবার। শেষ সম্বল হারিয়ে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও, যাঁদের কোথাও যাওয়ার উপায় নেই, তাঁরা নদীর পাড়েই বারবার ঘর পরিবর্তন করছেন। কোনো কোনো পরিবার ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছেন। সব হারিয়ে ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার এখন সরকারি রাস্তার ওপরেই জীবনসংগ্রাম চালাচ্ছেন।
শুধু বসতবাড়িই নয়, ভাঙনের মুখে পড়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে ২ও ৩ নম্বর আঙ্গারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ এবং মোল্লা বাড়ি। ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই এই প্রতিষ্ঠান ও বাড়িগুলো নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ভাঙনকবলিত এলাকার নিটুলী রানী ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, এ পর্যন্ত তিনি সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন। শেষ আশ্রয়টুকু নদী গিলে খাওয়ার পর এখন সরকারি রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা জাকির খান (৫০) বলেন, কত মানুষ আইলো, কত কথা কইলো, কাজের কিছুই হইলো না। আপনাদের সাথে কথা বলেই বা কী হবে? কেউ তো আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না।"
অন্য এক ভুক্তভোগী রিপন মাল (৩৭) জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই এই গ্রাম ভাঙছে। নিজের বয়সে ৫-৬ বার বসতঘর সরাতে হয়েছে। শেষে উপায় না দেখে এখন বাজারে বাসা ভাড়া করে থাকছি। তৃতীয় শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী সেতু ও তাওসিম বলে, নদীতে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, তাই এখন রাস্তার পাশে থাকি। সরকারের কাছে আমাদের আকুল দাবি, যেন আমাদের থাকার একটি ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন সিকদার জানান, ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর জন্য ১৯৭৭-৭৮ সালে নদীর অপর প্রান্তে বাকেরগঞ্জে নতুন চরে ৬০টি পরিবারের জন্য ৯০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাকেরগঞ্জের প্রভাবশালীরা তা জবরদখল করে রাখায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবারই সেই জমির মালিকানা পায়নি। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহীন গাজী বলেন, পায়রা নদীর ভাঙনে আমার ওয়ার্ডটি আজ বিলুপ্তির পথে। পুরো বাহেরচর গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে। নদীভাঙন রোধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আঙ্গারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাহেরচর গ্রামের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত সহায়তায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি।
দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হবে। একই সাথে স্থায়ী ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাাউবো) সাথে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









