সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

চার হাজার টাকার পুঁজি থেকে পাঁচ লাখের স্বপ্ন

রঙ-তুলিতে ইতি পাটোয়ারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা

প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

রঙ-তুলিতে ইতি পাটোয়ারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা

নিজ হাতে কাপড়ে নকশা করছেন ইতি পাটোয়ারী

নদীরপাড় ছোট্ট একটি গ্রাম। চারদিকে সংসারের কাজ, সন্তানের দায়িত্ব আর সমাজের চিরচেনা ধারণা—নারী মানেই রান্নাঘর আর পর্দার আড়াল। সেই বৃত্ত ভেঙে রঙ আর তুলির শক্তিতে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের নদীপাড়ার বাসিন্দা ইতি পাটোয়ারী। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সৃজনশীল মন আর নিরলস পরিশ্রম তাঁকে গড়ে তুলেছে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।

ইতি পাটোয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে প্রাচ্য চিত্রকলা ও মুদ্রণ শিল্পে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। তিনি দুই সন্তানের জননী এবং একটি শিক্ষক পরিবারের গৃহবধূ। তাঁর স্বামী আফজালুর রহমান পাকেরহাট সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। সংসার, সন্তান আর পেশাগত দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে সামলেও শিল্পীসত্তাকে হারিয়ে যেতে দেননি তিনি।

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভার-এ কাজ শুরু করেন ইতি পাটোয়ারী। তবে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সময়ানুবর্তিতা, সংসারের চাপ আর সন্তানদের দেখভালের ভার একসঙ্গে সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে ওঠে। তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—ঘরে বসে নিজের মতো করে কিছু করা যায় না কি? ইউটিউব ও ফেসবুকে হ্যান্ডপেইন্ট ও হস্তশিল্পের ভিডিও দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে তাঁর সুপ্ত শিল্পীসত্তা। ছোটবেলা থেকেই রঙ আর হাতের কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে নতুন পথ দেখায়।

২০২৩ সালের শুরুতে মাত্র চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তাঁর উদ্যোগ ‘ইতি কথা’। কিছু কাপড়, রঙ আর প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল কিনে হাতে আঁকা কয়েকটি পোশাক তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। অল্প সময়েই সাড়া মেলে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘ইতি কথা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ, যেখান থেকেই শুরু হয় নিয়মিত বিক্রি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চার হাজার টাকার পুঁজি আজ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসায়। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

ইতি পাটোয়ারীর নকশায় ফুটে ওঠে আবহমান বাংলার প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য আর রঙের নান্দনিক মেলবন্ধন। হ্যান্ডপেইন্ট শাড়ি, থ্রি-পিস, ওয়ানপিস, শিশুদের পোশাক, পাঞ্জাবি, কাপল সেট ও ফ্যামিলি সেট—সবকিছুই তিনি নিজ হাতে তৈরি করেন। ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা বাংলা নববর্ষ এলেই তাঁর ডিজাইন করা কাপল ও ফ্যামিলি সেটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি ইতি পাটোয়ারী। তিনি সৃষ্টি করেছেন কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। ইতোমধ্যে অন্তত ২৫ জন স্থানীয় নারীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের টিমে যুক্ত করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের কাছে স্বাবলম্বী হওয়ার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

দুই সন্তানের জননী ইতি পাটোয়ারী এক হাতে সামলান সংসার, অন্য হাতে তৈরি করেন পণ্য, আবার নিজেই অনলাইনে সেগুলোর বিপণন করেন। এই পুরো পথচলায় তাঁর পাশে থেকেছেন স্বামী আফজালুর রহমান। তাঁর সহযোগিতা আর উৎসাহই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

ইতি পাটোয়ারী বলেন, “আমার কাজগুলো কোনো কালেকশন নয়, এগুলো আমার ক্রিয়েশন। স্বামীর সহযোগিতা না থাকলে দুই বাচ্চা নিয়ে একা কখনোই এই কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। তাঁর সহযোগিতা আর নিজের মনোবল নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমার উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে অবহেলিত নারীরাও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়।”

সমাজের অন্য নারীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা আরও স্পষ্ট— “নাটক-সিরিয়াল কিংবা মোবাইলে অযথা সময় নষ্ট না করে যদি সেই সময়টুকু সৃজনশীল কাজে লাগানো যায়, তাহলে নিজের পাশাপাশি সমাজেরও উন্নয়ন সম্ভব। মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, তা সম্ভব হয়েছে কেবল ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের কারণে। নারীরা চাইলে সবই পারে।”

রঙ, তুলির টান আর অদম্য মনোবল—এই তিন শক্তিতেই ইতি পাটোয়ারী প্রমাণ করেছেন, নারী কখনোই সীমাবদ্ধ নয়; সে চাইলে নিজের জীবন যেমন বদলাতে পারে, তেমনি বদলে দিতে পারে আরও অনেক নারীর।


কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.