যমুনার চরজুড়ে সবুজ পাটের সমারোহ। প্রতিকূলতা, নদীভাঙন আর উৎপাদন ব্যয়ের চাপ উপেক্ষা করে পাট চাষে সাফল্য দেখাচ্ছেন বগুড়ার সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলের কৃষকেরা। কিন্তু উৎপাদনে সাফল্য এলেও সরকারি কৃষি প্রণোদনায় তাদের বড় অংশই রয়েছেন উপেক্ষিত। কৃষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর আবাদ করেও অনেকেই সরকারি সহায়তার তালিকায় জায়গা পান না।
যমুনার চরাঞ্চলে গিয়ে ৩৫ বছর বয়সী কৃষক মরিয়ম বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “আমরা এক মুঠো সরিষার দানাও সরকারি সহায়তা পাইনি কোনো দিন। অনেকেই অনেক কিছু পান, কেউ সার পান, কেউ বীজ পান। আমরা কিছুই পাই না। নিজেরাই বাজার থেকে বীজ ও সার কিনে এনে আবাদ করি। খুব কষ্টে আমাদের সংসার চলে।”
মরিয়মের অভিযোগ যে বিচ্ছিন্ন নয়, তা উঠে এসেছে চরাঞ্চলে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে। অন্তত ৫০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে অধিকাংশই সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ার কথা জানান। তাদের অভিযোগ, প্রণোদনা পেতে কৃষি অফিসে ঘোরাঘুরি কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ প্রয়োজন হয়। এসব করতে না পারায় তারা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।
শালুকা চরের ৬৭ বছর বয়সী কৃষক সাহেদজামান জানান, প্রায় তিন বছর আগে কৃষি অফিস থেকে একবার সরিষার বীজ পেয়েছিলেন। কিন্তু সার কোনো দিন পাননি। তাঁর দাবি, গত তিন বছরে কৃষি অফিসের কেউ তাদের কাছে আসেননি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর চরাঞ্চলের চরবাটিয়া ও শালুকা চরে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়। কৃষকেরা জানান, তারা মূলত কৃষিনির্ভর জীবনযাপন করেন। তবে তাদের অধিকাংশের নিজস্ব জমি নেই। অন্যের জমি শনপত্তন নিয়ে সেখানে আবাদ করেন।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলে কৃষক রয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার। এর বিপরীতে চলতি মৌসুমে সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন মাত্র ২৭০ জন। এসব কৃষককে দেওয়া হয়েছে এক কেজি পাটবীজ, পাঁচ কেজি ডিএপি এবং পাঁচ কেজি এমওপি সার।
চরবাটি গ্রামের ৫০ বছর বয়সী নিলি বেগম বলেন, “বছর দুয়েক আগে এক কেজি সরিষার বীজ পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। কেউ আর আমাদের কাছে আসেইনি। কীভাবে প্রণোদনা পাওয়া যায়, সেটাও তো আমরা জানি না।”
শালুকারচরের ৩০ বছর বয়সী লেমন ইসলাম এবার আট বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনিও বছর খানেক আগে এক কেজি সরিষার বীজ পেয়েছিলেন। এর বাইরে কৃষি অফিস থেকে আর কোনো সহায়তা পাননি। সারও কখনো পাননি বলে জানান তিনি।
শালিকার চরের ৪০ বছর বয়সী কৃষক মন্তেজার মণ্ডল প্রায় ২০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। এবার পাঁচ বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছেন। তবে তাঁর দাবি, এত বছরেও কৃষি অফিসের কোনো প্রণোদনা পাননি।
মন্তেজার মণ্ডল বলেন, “কৃষি অফিসের কেউ কোনোদিন আমার কাছে আসেনি। সরকারদলীয় লোকজনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়তা পান। প্রণোদনা আমাদের জন্য না।”
একই অভিযোগ ৭৫ বছর বয়সী কৃষক আজিজার প্রামাণিকের। তিনি জানান, তিন বছর আগে পাট, ভুট্টা, গম, সার ও সরিষার বীজ পেয়েছিলেন। এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি।
চরের কৃষকদের অভিযোগের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও তাদের জন্য বড় চাপ। এক বিঘা জমির পাট কাটা থেকে শুরু করে জাগ দেওয়া ও ধোয়ার কাজ পর্যন্ত অন্তত ১২ জন শ্রমিক প্রয়োজন হয়। প্রতি শ্রমিকের মজুরি ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে বীজ ও সারের খরচ। কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে প্রায় দেড় বস্তা সার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে প্রতি বস্তা সারের দাম প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। কৃষকদের মতে, আবাদ থেকে বাজারে পাট তোলা পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। সব খরচ বাদ দিয়ে এক বিঘা জমির পাট বিক্রি করে তাদের আয় হয় প্রায় আট হাজার টাকা।
তারপরও পাট উৎপাদনে পিছিয়ে নেই সারিয়াকান্দির যমুনার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ১০৫ হেক্টর। সেখানে আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে—লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই হাজার হেক্টর বেশি। এর মধ্যে যমুনার চরাঞ্চলেই পাট আবাদ হয়েছে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে।
কৃষি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় পাটের গড় ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ দশমিক ৮ মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, যমুনার চরের ৩৭টি ব্লকের মধ্যে ১৯টিতে পাটের আবাদ হয়েছে। ৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন পাট। বর্তমানে প্রতি মণ পাটের দাম প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা। সেই হিসাবে উৎপাদিত পাটের বাজারমূল্য প্রায় ৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
সরেজমিনে আরও জানা গেছে, চরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকই নদীভাঙনের শিকার। যমুনার ভাঙনে তাদের বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। এখন অন্যের জমি শনপত্তন নিয়ে এসব চরে বাড়িঘর ও আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা। নিয়মিত দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এসব কৃষকের দাবি, সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এ বিষয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, “হাজার হাজার কৃষকের মধ্যে ২৭০ জন প্রণোদনা পেয়েছেন, যা সত্যিই যথেষ্ট নয়। শিগগিরই আমরা আরও কৃষককে প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









