বর্ষার জল যখন ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে, বিল-নদীর বুক তখন যেন ডেকে ওঠে গ্রামবাংলার চিরচেনা এক উৎসবকে। কাঁধে পলো, হাতে জাল আর চোখে মাছ ধরার উচ্ছ্বাস—শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই নেমে পড়েন জলে। মুহূর্তেই শান্ত জলরাশি পরিণত হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মঞ্চে। এ শুধু মাছ ধরার আয়োজন নয়; এ যেন শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক নির্মল উৎসব—পলো বাওয়া।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের বিভিন্ন বিল ও নদীতে এখন সেই চিরচেনা দৃশ্য। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পানি কমতে শুরু করতেই উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ে বসছে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবের আসর। প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার কোনো না কোনো বিল বা নদীতে দেখা মিলছে এমন আয়োজনের। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও পলো ও জাল নিয়ে নেমে পড়ছেন পানিতে।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নের অলহরি নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব। সকাল থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন বয়সী মানুষ পলো, জালসহ মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম নিয়ে নদীর পাড়ে জড়ো হতে থাকেন। কারও হাতে বাঁশের তৈরি পলো, কারও হাতে জাল—সবার চোখেমুখে ছিল মাছ ধরার আনন্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাস।
শত শত মানুষ একসঙ্গে নদীতে নেমে পড়লে অলহরি নদীর শান্ত জল যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায়। কেউ পলো ডুবিয়ে মাছ খুঁজছেন, কেউ জাল ফেলছেন, আবার কেউবা অন্যের পলোয় মাছ উঠল কি না, সেই অপেক্ষায় তাকিয়ে আছেন। নদীর দুই পাড়ে তখন উৎসুক মানুষের ভিড়। হাসি-আনন্দ আর হৈচৈয়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
স্থানীয় আবুল হাসিম বলেন, ‘পলো বাওয়া শুধু মাছ ধরার উৎসব নয়, এটি আমাদের শেকড় ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আনন্দের আয়োজন। দীর্ঘদিন পর সবাই মিলে এমন উৎসবে অংশ নিতে পেরে আমরা আনন্দিত। ভবিষ্যতেও এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই।’
স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদী, খাল ও জলাশয়ে পানি বাড়লে পলো দিয়ে মাছ ধরার এমন আয়োজন গ্রামবাংলার পুরোনো ঐতিহ্য। একসময় গ্রামের মানুষের কাছে পলো বাওয়া ছিল বহুল প্রতীক্ষিত একটি আয়োজন। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এলেও ত্রিশালের গ্রামীণ জনপদে এখনো টিকে আছে সেই ঐতিহ্যের ছাপ।
কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে এ ধরনের উৎসবে মানুষ কিছুটা সময়ের জন্য ফিরে যান আপন শেকড়ের কাছে। একই গ্রামের নানা বয়সী মানুষ একসঙ্গে পানিতে নামেন, মাছ ধরেন, আনন্দ ভাগাভাগি করেন। এতে শুধু বিনোদনই হয় না, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়।
উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর গ্রামের নুরুল আমিন বলেন, ‘আমরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে পলো উৎসবে অংশ নিই। অধিকাংশ মানুষ এককভাবে এতে অংশ নেন। আবার ১৫-২০ জন মিলে দলবদ্ধভাবেও মাছ ধরেন। এ ক্ষেত্রে একজন মাছ পেলেও সবাই মিলে তা ভাগ করে নেন।’
এই ভাগাভাগির মধ্যেই যেন পলো বাওয়ার আসল আনন্দ। কে কত বড় মাছ পেলেন, তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একসঙ্গে মাছ ধরার আনন্দ। কারও পলোয় মাছ উঠলে আশপাশের সবাই যেমন আনন্দ পান, তেমনি সেই মাছের ভাগও জোটে সবার কপালে। মাছ ধরার উপলক্ষটি তখন আর ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের আনন্দ।
নদীর পানিতে পলো ডোবানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন ডুবে যায় শহুরে ব্যস্ততা, ফিরে আসে শৈশবের সরলতা। কয়েক ঘণ্টার এই আয়োজন শেষে মানুষ হয়তো খালি হাতে ঘরে ফেরেন, আবার কারও ঝুড়িতে ওঠে দেশি মাছ। কিন্তু সবার সঙ্গেই থেকে যায় একরাশ আনন্দ, স্মৃতি আর একসঙ্গে থাকার উষ্ণতা।
বিল-নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তাই ত্রিশালের গ্রামীণ জনপদে এখন শুধু মাছ ধরার মৌসুম নয়, জেগে উঠেছে ঐতিহ্যেরও উৎসব। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা পলো বাওয়া যেন মনে করিয়ে দেয়—আধুনিকতার ভিড়েও বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের সেই নাড়ির টান এখনো অটুট।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









