আশ্বিনের থইথই জলে রূপালি মাছের খেলা হওয়ার কথা। বর্ষার পানি নামার আগে নদী-খাল, বিল আর আমনখেতে দেশীয় মাছের বিচরণে মুখর থাকার কথা জলাভূমি। কিন্তু সেই জলেই এখন নেমে এসেছে নীরব ঘাতকের ফাঁদ। বগুড়ার ১৩ উপজেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলমগ্ন আমনখেতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ফাঁসের ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। অল্প সময়ে বেশি মাছ ধরার লোভে পাতা এ জালে একসঙ্গে ধরা পড়ছে রেনু, পোনা ও মা মাছ। রেহাই পাচ্ছে না জলজ প্রাণীরও।
সরেজমিনে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা গেছে, সবুজ ধানের সারির গা ঘেঁষে কিংবা খালের পানিতে রিং আকৃতির দীর্ঘ জাল পেতে রাখা হয়েছে। পানির স্রোতের সঙ্গে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ঢুকে পড়ছে এসব ফাঁদে। বের হওয়ার পথ না থাকায় জালে আটকে মারা যাচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। অনেক সময় জালের সঙ্গে উঠে আসা ব্যাঙ, শামুক, কাঁকড়া ও জলঢোড়া সাপও জীবন্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে ডাঙায়।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, ‘চায়না দুয়ারি’ শুধু মাছ ধরার সরঞ্জাম নয়; এটি জলাভূমির স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রজননব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত। জালের ফাঁস অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ে। ফলে প্রজনন মৌসুমে নতুন প্রজন্ম তৈরি হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক দেশীয় মাছ ধ্বংস হচ্ছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় জলাশয়গুলো থেকে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর প্রভাব শুধু মাছেই সীমাবদ্ধ নয়। জলাভূমির পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যাঙ, শামুক, কাঁকড়া ও বিভিন্ন ছোট জলজ প্রাণীও এই জালে আটকা পড়ছে। এসব প্রাণী জলাভূমিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ফলে নির্বিচারে চায়না দুয়ারি ব্যবহারের কারণে জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে।
বগুড়ার মাজবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. রশীদ মিয়া বলেন, ‘মাছের চেয়ে এই জালে বেশি মরছে জলজ প্রাণী। সামান্য কয়েকটা ছোট মাছ বেচতে গিয়ে পুরো বিলের জীবনপ্রবাহই শেষ করে ফেলা হচ্ছে।’
সাতবেকি গ্রামের আবু হানিফ বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে স্থায়ী তদারকি না থাকায় এর ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে। কেবল হাট-বাজারে অভিযান চালিয়ে এই জাল বিক্রি বন্ধ না করলে আগামীতে বিলে আর কোনো দেশি মাছের দেখা মিলবে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বগুড়ার ধুনট, সারিয়াকান্দি, শেরপুর, শাজাহানপুর, সোনাতলা, কাহালু, নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, সান্তাহার, মোকামতলা, শিবগঞ্জ ও বগুড়া সদরসহ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে এ জালের বিস্তার রয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিটি উপজেলাতেই বিপুলসংখ্যক চায়না জাল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে জালের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
একসময় বগুড়ার করতোয়া, বাঙালি, ইছামতী, হরাসাগরসহ নদ-নদী ও জলাশয়গুলো ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান আধার। মৌসুমে মাছের প্রাচুর্যে ঘরে ঘরে তৈরি হতো নানা ধরনের দেশীয় মাছের শুঁটকি। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কারেন্ট জালের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ফাঁসের চায়না দুয়ারি যেন জলজ প্রাণীর জন্য আরও ভয়ংকর মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে।
চায়না দুয়ারির অবৈধ ব্যবহার নিয়ে
বগুড়া জেলার বর্তমান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ খালেকুজ্জামান সরকার
বলেন, ‘চায়না জালের ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার আইনিভাবে দণ্ডনীয়। আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। তবে মানুষের আত্মসচেতনতা না বাড়লে কেবল আইনি শক্তিতে এটি নির্মূল করা কঠিন।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে চায়না দুয়ারির বিস্তার ঠেকানো কঠিন। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান, জব্দ করা জাল ধ্বংস এবং জেলেদের মধ্যে বিকল্প ও টেকসই মাছ ধরার পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
অন্যথায় অল্প কিছু মাছ ধরার তাৎক্ষণিক লাভের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে বগুড়ার নদী-খাল-বিলের দীর্ঘদিনের জলজ বৈচিত্র্য। জলতলে পাতা এই ‘ঘাতকের জাল’ শুধু মাছ নয়—ধ্বংস করছে একটি সম্পূর্ণ জলজ পরিবেশব্যবস্থা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









