দেশের শিল্পাঞ্চল খ্যাত ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় সরকারের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা বরাদ্ধে ব্যাপক নয়ছয় ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের ঘটনায় সরেজমিনে তদন্তপূর্বক দায়িদের শাস্তি দাবি করেছেন স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি। এনিয়ে জনমনে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১০ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় হবিরবাড়ী সোনার বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের মেইন গেইট থেকে মাঠের উত্তর পাশ হয়ে চারতলা ভবন পর্যন্ত রাস্তা সলিংকরণ প্রকল্পে ২ লাখ টাকা এবং স্কুলে চারতলা ভবনের পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা সলিংকরণ প্রকল্পে আরও ২ লাখসহ মোট টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রথম প্রকল্পটির কিঞ্চিৎ কাজ রূপায়ণ হলেও দ্বিতীয় প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই।
স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, হবিরবাড়ী ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য রেহেনা খাতুন এবং পিআইও মিলে এই প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবিলম্বে প্রকল্পগুলোর কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হোক।
একইভাবে কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় উপজেলার মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের দায়রা নজরুল ডাক্তারের বাড়ী হইতে রফিকুলের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাট ও এইচবিবিকরণ প্রকল্পে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে মাত্র দুই গাড়ী ইটে লোক দেখানো উপস্থিতি ঘটিয়ে সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য শারমিন আক্তার দিনা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যোগসাজসে বাকি অর্থ আত্মস্বাধ করে।
এমন অভিযোগ করে স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমীন ও আব্দুল আওয়াল বলেন, দুই গাড়ী তিন নম্বর ইট, দুইটি মাহিন্দ্র বালু আর ৩২ হাজার টাকা শ্রমিকের মজুরি খরচ করে প্রকল্পের বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আমরা এই লুটপাটের সঠিক হিসাব চাই।
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী আবুল হোসেন ও মুদি দোকানদার আব্দুল করিম বলেন, মল্লিকবাড়ী ইউনিয়নের মোড়ল বাড়ী মোড় হইতে এক্সিলেন্ট সিরামিক কারখানা পর্যন্ত টিআর প্রকল্পে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৩টি স্থানে ৫০ থেকে ১০০ মিটার জোড়াতালির কাজ করে বাকি অর্থ আত্মস্বাৎ হয়েছে।
তবে ধীতপুর এলাকায় নিন্মমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বন্ধ করে দিয়েছে একটি রাস্তার কাজ। এ ঘটনায় মিথ্যা অভিযোগে এলাকাবাসীকে হয়রানির অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মো: রফিকুল ইসলাম।
স্থানীয় বিএনপি নেতা মো: মহর উদ্দীন বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: মহিদুল আলম বরাদ্দের অনুকূলে প্রকল্প তৈরী করে বিল উত্তোলন করে নিচ্ছেন। অথচ বেশির ভাগ প্রকল্পে এখনো শুরু হয়নি বা শেষ হয়নি। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক।
উপজেলার ডাকাতিয়া ইউনিয়নেও টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে ঘটেছে একই কারসাজি। সরেজমিনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হিজলীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের সড়ক সংস্কারে ১ লাখ ২০ হাজার, রাজ্জাক মেম্বারের বাড়ী থেকে মুক্তিযোদ্ধা নহর আলীর বাড়ী পর্যন্ত ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়। বাস্তবে বিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে কোন সংস্কার কাজ হয়নি। তবে অন্য রাস্তাটিতে নামমাত্র এইচবিবিকরণ শুরু করে অর্ধেকের বেশি অংশ বাকি রেখেই দায় সেরেছে প্রকল্প কমিটি। অথচ কাগজে কলমে কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ ও খাদ্যশস্য তুলে নেওয়া হয়েছে।
ডাকাতিয়া এলাকার বাসিন্দা শরীফ মিয়া বলেন, কাজ না করেই টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ তুলে নিয়েছেন প্রকল্প কমিটির সভাপতিসহ অন্যরা। আমরা চাই সরেজমিনে এসব ঘটনার তদন্ত হোক।
ডাকাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি মো: আব্দুর রাজ্জাকের কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজী হননি। তবে প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য পারুল আক্তার বলেন, প্রকল্পের প্রাথমিক কাগজে আমি স্বাক্ষর করেছি, কিন্তু পরবর্তীতে পিআইও ও মেম্বারের যোগসাজশে প্রকল্পটিতে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে আমি চূড়ান্ত বিলের নথিতে স্বাক্ষর করিনি।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মহিদুল আলম প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের অর্থ কাগজেপত্রে নয়ছয় করে লুটপাট করছেন। প্রতিটি প্রকল্প থেকে তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের কমিশন। এ সুযোগে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা কাজ না করেই বরাদ্দ আত্মস্বাৎ করছে।
এসব ঘটনায় বক্তব্য জানতে চাইলে পিআইও মহিদুল আলম বলেন, "অসম্পূর্ণ এইচবিবি রাস্তার বিষয়ে আমি অবগত নই, সরেজমিনে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেব। ইউপি সদস্য পারুল আক্তার যে প্রকল্পে সই করেনি বিধি অনুযায়ী সেই প্রকল্পের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। মাটি কাটার বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলেন, এলাকাবাসীর অনুরোধে মাটি কাটা প্রকল্পের অর্থ দিয়ে একটি স্কুলের মাঠ সংস্কার করা হয়েছে। এ সময় অন্যান্য প্রকল্প সর্ম্পকে জানতে চাইলে শতভাগ নিয়ম মেনে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে পিআইও কিছু প্রকল্পে অনিয়মের কথা স্বীকার করলেও পুরো উল্টো কথা বলছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: ফিরোজ হোসেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পেই অনিয়ম হয়নি।
এবিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সাইফুর রহমান বলেন, কোন প্রকল্পের কাজ একেবারে না করে বিল পরিশোধ কাম্য নয়। সরেজমিনে ঘটনাটি যাচাই করে দেখব। কোন প্রকল্পে অনিয়ম হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









