দীর্ঘ ২৯ বছরের শিক্ষকতা জীবন। এই দীর্ঘ সময়ে কত শিক্ষার্থী তার হাত ধরে শিখেছে জীবনের প্রথম পাঠ, কত তরুণ স্বপ্ন দেখেছে ভবিষ্যৎ নিয়ে, কত পরিবার তাকে দেখেছে সন্তানের পথপ্রদর্শক হিসেবে—তার হিসাব হয়তো কোনো খাতায় লেখা নেই। তবে সেই ভালোবাসার হিসাব লেখা ছিল শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে।
শিক্ষকতা জীবনের সেই দীর্ঘ পথচলার শেষে যখন অবসরের সময় এলো, তখন প্রিয় শিক্ষককে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাতে পারেনি তার শিক্ষার্থীদের মন। তাই বিদায়টাও হলো ব্যতিক্রমী, ভালোবাসায় ভরা এবং স্মরণীয়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে বর্ণি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। একই অনুষ্ঠানে ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্ণি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শ্রী বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীকে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিদায়ী সংবর্ধনা দিয়েছেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
প্রিয় শিক্ষককে গাড়িবহরে করে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। যেন একজন শিক্ষককে বিদায় নয়, বরং তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করার আয়োজন।
দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষককে ঘিরে অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে স্মৃতি আর আবেগের মিলনমেলা।
গাড়িবহরে করে বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসার সময় সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাকে সম্মান জানান। একসময় যাদের হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়ে পাঠ শিখিয়েছেন তিনি, সেই শিক্ষার্থীরাই এদিন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে।
শুধু ফুলেল শুভেচ্ছা কিংবা সম্মাননাতেই থেমে থাকেনি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা। প্রবাসী সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাকে উপহার দেওয়া হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি চেক। অনুষ্ঠানে তার হাতে সম্মাননা হিসেবে সাড়ে ৩ লাখ টাকার সেই চেক তুলে দেওয়া হয়।
একজন শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি শিক্ষার্থীদের এই ভালোবাসার প্রকাশ অনুষ্ঠানে তৈরি করে বিশেষ আবেগঘন মুহূর্ত। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইসলাম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান শিক্ষক বাবুল হোসেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ১ নম্বর বর্ণি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বর্ণি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি জাহিদ হাসান শিমুল, সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব সাইফুজ্জামান সরোয়ার, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সভাপতি সুবেদার রিয়াজউদ্দিন, সাবেক সভাপতি আব্দুল মুহাইমিন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল আলিম মত, মাইজগ্রাম আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজাম উদ্দিন, বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কায়েদে আজম, ফকিরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবলু হোসেন এবং শিল্পপতি ও সমাজসেবক জামাল সৈয়দ জুবের।
শিক্ষকদের পক্ষে বক্তব্য দেন আব্দুর রহিম ও বীথিকা রানী। বক্তব্যে তারা বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গঠনে তার অবদানের কথাও স্মরণ করেন বক্তারা।
তাদের বক্তব্যে উঠে আসে একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জীবনে তার যে গভীর প্রভাব থাকে, তার কথা। শ্রেণিকক্ষের পাঠ শেষ হয়ে গেলেও একজন ভালো শিক্ষকের শিক্ষা যে শিক্ষার্থীর জীবনে দীর্ঘদিন থেকে যায়—বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন যেন তারই একটি উদাহরণ।
বক্তারা বিদায়ী শিক্ষক বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীর সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গলময় অবসরজীবন কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে গ্রামের মুরব্বি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। নতুনদের হাতেও তুলে দেওয়া হলো শুভকামনা।
একই অনুষ্ঠানে ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অতিথিরা তাঁদের আগামী দিনের শিক্ষাজীবনে সাফল্য ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করেন।
একদিকে ২৯ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে বিদায় নিলেন প্রিয় শিক্ষক শ্রী বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন জীবনের পথে যাত্রা শুরু করল একদল শিক্ষার্থী। ফলে একই অনুষ্ঠানে যেন মিলেমিশে যায় দুটি বিদায়।
বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তীর বিদায়ী সংবর্ধনায় সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। গাড়িবহরে করে তাঁকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসা, সম্মাননা প্রদান এবং প্রবাসী সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক উপহার দেওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গভীর সম্পর্কের চিত্র ফুটে ওঠে।
দীর্ঘ ২৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষে বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী শ্রেণিকক্ষ থেকে বিদায় নিলেও তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্মৃতি ও ভালোবাসায় তিনি থেকে যাবেন প্রিয় শিক্ষক হিসেবেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









