কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ অ্যানথ্রাক্স বা ‘তড়কা’র প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। একসময় উপজেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকা, বিশেষ করে ভারত সীমান্তসংলগ্ন গ্রামগুলোকে রোগটির ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে অ্যানথ্রাক্স আর সেসব এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। প্রতিদিনই আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে। গত ২৩ দিনে উপজেলায় অন্তত ৪৭ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুর একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক রোগ। আক্রান্ত পশুর রক্ত, চামড়া, মাংস বা অন্যান্য টিস্যুর সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে অসুস্থ পশু জবাই করা, কাঁচা মাংস নাড়াচাড়া করা এবং যথাযথ সতর্কতা ছাড়াই তা প্রক্রিয়াজাত করার সময় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে পশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শ থেকে মানুষকে দূরে রাখাও রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আক্রান্ত পশুর মাধ্যমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকাতেও রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এমদাদুল হক টোটন বলেন, সারা বছরই অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসেন। উপজেলার যে গ্রামগুলোকে আগে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এখন রোগের বিস্তার শুধু সেখানে সীমাবদ্ধ নেই; উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে এটি ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে এবং অসুস্থ পশুর সংস্পর্শে আসা বন্ধ না করলে এ রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা অসম্ভব।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্তদের অধিকাংশই অসুস্থ গবাদিপশু জবাই করা, কাঁচা মাংস নাড়াচাড়া করা এবং অসচেতনভাবে তা প্রক্রিয়াজাত বা গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ অসুস্থ পশুর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শই অনেক ক্ষেত্রে মানুষের শরীরে সংক্রমণের কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অসুস্থ পশু দ্রুত কম দামে বিক্রি করে দেওয়া কিংবা জবাই করে মাংস ব্যবহার করার প্রবণতা থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুর একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক রোগ, যা পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিনেটিং ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে, অনেকেই পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তা দ্রুত কম দামে বিক্রি বা জবাই করে ফেলছেন। অসচেতনতার কারণে আক্রান্ত পশুর কাঁচা মাংস নাড়াচাড়া করায় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, খামারি ও স্থানীয়দের বারবার সতর্ক করা হচ্ছে—কোনো পশু অসুস্থ হলে তা কোনোভাবেই জবাই বা বিক্রি করা যাবে না। অসুস্থ বা আক্রান্ত পশু যথাযথ নিয়ম মেনে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে।
অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন পশুর সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংস্পর্শ বন্ধ করা। কোনো পশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটিকে জবাই কিংবা বিক্রি না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আক্রান্ত পশুর মাংস কাটা, পরিষ্কার করা বা নাড়াচাড়া করার মাধ্যমে যারা সংস্পর্শে আসেন, তাদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তাই রোগের উপসর্গ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি হাট-বাজার ও পশু জবাইয়ের স্থানগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে অবিলম্বে যেকোনো অসুস্থ পশুর খবর নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ অফিসে জানানোর এবং মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে হাট-বাজারে পশু জবাই প্রক্রিয়ায় সরকারি নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, অসুস্থ পশু জবাই ও বিক্রি বন্ধ করা, আক্রান্ত এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো জরুরি। না হলে সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









