কথিত অলৌকিক সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন কেনাবেচার মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অভিযান পরিচালনা করে শ্রীমঙ্গল এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- রাজনগরের বাংলাটিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের বাসিন্দা এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গলের উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল অভিযান পরিচালনা করে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে ইলিয়াছুর ও ইকরামকে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আখতারুজ্জামান ও ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, প্রতারণায় ব্যবহৃত ১টি নোহা গাড়ি ও ১টি পকেট রাউটার, ৮টি মোবাইল ফোন ও ১০টি সিমকার্ড, ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর ১টি ভুয়া সনদপত্র, ভুয়া বিজনেসের ৯৪ পাতা চুক্তিপত্র, ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড ও ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬টি ভুয়া স্ট্যাম্প, ৩টি চেকবই, ১টি ব্ল্যাংক কয়েন অ্যালবাম ও ১টি ডায়েরি।
তদন্তে জানা যায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের Heritage Auction, Lockheed Martin, BlackRock, ও Microsoft-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশী প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছিল। এর আগেও ২০২৩ সালে ঢাকা ডিবি পুলিশের হাতে এই চক্রের অন্যতম মূলহোতা আখতারুজ্জামানসহ ৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছিল।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসাহস্রো গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমকে (৩৫) তার পরিচিত ইলিয়াছুর রহমান জানান, চাতলাপুর চা বাগানে ব্রিটিশ আমলের একটি অতি মূল্যবান ধাতব বস্তু (সীমানা পিলার/কয়েন) রয়েছে, যার বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। রহিমকে বিশ্বাস করাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘US Heritage Auction’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয়ে কথা বলেন আখতারুজ্জামান। এরপর কথিত এক ‘এক্সপার্ট’ এনে ১৯ আগস্ট ২০২৩ তারিখে চা বাগানে সেটি পরীক্ষা করে ভুয়া নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। বস্তুটি কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নামে ভিকটিমের প্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে ৪টি চেকের মাধ্যমে ১ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে নগদ ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। ২৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে বস্তুটি একটি বক্স সিলগালা করে ভিকটিমদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয় দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে বস্তুটি নেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময় পর ভিকটিম ও তার ভাই কৌতূহলবশত বক্সটি খুললে দেখা যায়, ভেতরে কোনো মূল্যবান বস্তু নেই, রয়েছে একটি জ্যান্ত সাপ।
বিষয়টি প্রতারকদের জানালে তারা অবিশ্বাস্য এক গল্প ফাঁদে। তারা দাবি করে, টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে মূল্যবান আইটেমটি জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর সেটি আবার আগের রূপ ফিরে পাবে। পরবর্তীতে এই আশ্বাস এবং নতুন আরেকটি মূল্যবান বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে ভিকটিমের কাছ থেকে আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। সর্বমোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা প্রতারণা করার পর চক্রের সদস্যরা ফোন বন্ধ করে গা-ঢাকা দেয়।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা বলেন, ‘‘এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে এই চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অলৌকিক ক্ষমতাভিত্তিক ধাতব বস্তু, পিলার বা অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভনে কান না দিতে এবং যেকোনো সন্দেহজনক লেনদেন থেকে সতর্ক থাকতে সর্বসাধারণের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









