চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো এক সবুজ উঠানে, কামরাঙার পাতার আড়ালে হঠাৎ নড়ে উঠল ডাল। একটু ভালো করে তাকাতেই চোখে পড়ল সবুজের ভেতর আরেক টুকরো সবুজ। চুপচাপ বসে থাকা পাখিটির শরীরে যেন পাতারই ছায়া। এ যেন বহুদিন পর ফিরে আসা কোনো পুরোনো অতিথি—হীরামন টিয়া।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা মিলেছে হারিয়ে যেতে বসা হীরামন বা ফুলমাথা টিয়ার। পাখিটির ছবি তুলেছেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার ক্যামেরায় ধরা পড়া এই হীরামন যেন মনে করিয়ে দিল, একসময় উত্তরাঞ্চলের গ্রামবাংলায় এমন দৃশ্য খুবই পরিচিত ছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রাম-গঞ্জে একসময় ফলের গাছ মানেই ছিল পাখির আনাগোনা। বাড়ির উঠানে কামরাঙা, পেয়ারা কিংবা নানা দেশি ফলের গাছ ঘিরে সকাল-বিকেল মুখর থাকত পাখির কলকাকলিতে। সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতি। ফলের গাছ কমেছে, কমেছে গাছপালা ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল। আর তার সঙ্গে কমেছে হীরামনের দেখাও।
হীরামনের অন্যতম পছন্দের খাবার দেশীয় ফল কামরাঙা। কামরাঙাগাছের পাতা ও ফলের সঙ্গে পাখিটির শরীরের রঙের মিল থাকায় পাতার আড়ালে বসে থাকলে তাকে সহজে শনাক্ত করা যায় না। একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির বাগানে, বিশেষ করে ফলের গাছে, নিয়মিত দেখা যেত এই পাখিকে। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল।

পাখিটির আলোকচিত্রী ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, একসময় উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব জায়গাতেই হীরামন দেখা যেত। এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ফলের গাছ কমে যাওয়া এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় ধীরে ধীরে পাখিটির সংখ্যা কমছে।
হীরামন দেখতে ছোট হলেও রঙের বৈচিত্র্যে বেশ আকর্ষণীয়। সাধারণত পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার; লেজসহ তা প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। পুরুষ হীরামনের মাথার পেছনে মুকুটের মতো অংশ থাকে। নাক ও গালের রং গোলাপি থেকে ফ্যাকাশে নীল। গলায় সরু কালো কলার এবং চিবুকে থাকে কালো ডোরাকাটা দাগ। স্ত্রী পাখির মাথা ফ্যাকাশে ধূসর; গলায় কালো কলার ও চিবুকে ডোরাকাটা দাগ থাকে না। অপরিণত পাখির মাথা সবুজ ও চিবুক ধূসর এবং তাদের লাল কাঁধের প্যাচ থাকে না।
গাছের গর্তেই বাসা বাঁধে হীরামন। একবারে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি সাদা ডিম দেয়। ফলের গাছ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়ায় পাখিটির বিচরণও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
হীরামনের গল্পটি শুধু একটি পাখির গল্প নয়; এটি বদলে যাওয়া গ্রামবাংলারও গল্প। যে উঠানে একসময় ফলের গাছ ছিল, সেখানে এখন অনেক জায়গায় বসতি। যে গাছের ডালে পাখিরা আশ্রয় নিত, সেসব গাছও কমছে। ফলে খাবার ও নিরাপদ আবাসস্থল—দুটিই সংকুচিত হচ্ছে।
জনপ্রিয় অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ফজলুর রহমান বাবুও ‘হীরামন পাখি’ নামে গান গেয়েছেন। সেই গানের মতোই প্রকৃতিতে হীরামনের উপস্থিতিও একসময় ছিল পরিচিত ও আপন। কিন্তু সেই পরিচিত পাখিটিই এখন যেন গল্পের চরিত্র হয়ে উঠছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সম্প্রতি হীরামনের দেখা পাওয়া তাই শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দের খবর নয়; এটি হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় জীববৈচিত্র্যের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ফলের গাছ আর সবুজের আবাস ফিরিয়ে দিতে পারলে হয়তো একদিন আবার উত্তরাঞ্চলের আকাশে শোনা যাবে সেই পুরোনো কিচিরমিচির।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









