রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে মব সৃষ্টি করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ছাত্র-জনতার নামে ব্যানারে একদল ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এ ঘটনা ঘটান। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ সময় তারা নিজেদের কৃষকদল ও সাধারণ ছাত্রজনতা হিসেবে পরিচয় দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে জানা যায়, মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি মিছিল নিয়ে জোরপূর্বক উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ঢাকার ঠিকাদারদের দেওয়ার অভিযোগ তুলে উপাচার্য ও সেকশন অফিসারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে আগে থেকে লিখে রাখা পদত্যাগপত্রে তাদের জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। স্বাক্ষর নেওয়ার পর তাদের কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন।
এদিন বিকেলে উপাচার্যের রেস্ট হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিবরণ দেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক এবং তার পিএস নাজমুল হোসাইন। সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য জাওয়াদুল হক জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি দল তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয়দের কাজ না দেওয়ার অভিযোগ তোলে। একপর্যায়ে তাঁকে চেয়ার ছেড়ে বের হয়ে যেতে বলা হয় এবং একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়। কাগজটি পড়তে চাইলে তাঁকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি বাধ্য হয়ে তাতে স্বাক্ষর করেন। তাঁর ধারণা, সেটি পদত্যাগপত্র ছিল।
পরে তাঁকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কিছু সময়ের জন্য তাঁর মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর কার্যালয়ের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই ও বিদ্যুৎ সংযোগ নষ্ট করা এবং বিভিন্ন দপ্তরে তালা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
ঘটনার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের ইন্ধন রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে বের করতে হবে। হামলাকারীদের বহন করা ব্যানারে ‘কৃষক দল’ ও ‘ছাত্র-জনতা’ ধরনের শব্দ ছিল বলে জানান তিনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। এর আগে একই ধরনের একটি দল তাঁকে স্থানীয়দের কাজ না দেওয়া এবং পদে না থাকার হুমকি দিয়েছিল বলেও জানান তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নিয়োগসংক্রান্ত যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো সত্যতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, ভাঙচুর, সিপিইউ নিয়ে যাওয়া ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় থানায় জিডি করা হবে। বিষয়টি মন্ত্রী ও সচিবকেও জানানো হয়েছে।
কার্যালয়ে তালা থাকায় জোর করে সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত সমাধান না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও চলমান প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
উপাচার্যের ব্যাক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসাইন সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান,আজ (গতকাল) সকালে উপাচার্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি অনলাইন বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে একদল ব্যক্তি মিছিল নিয়ে জোর করে কক্ষে প্রবেশ করে উপাচার্যকে গালিগালাজ করতে থাকেন। পরে পূর্বপ্রস্তুত করা পদত্যাগপত্রে উপাচার্যের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর তাকেও পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত বলেন,আমি ঢাকায় আছি, এই ঘটনা সর্ম্পকে আমি কিছুই জানিনা। আমাদের দলের কেউ যদি এই ঘটনায় জড়িত থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সঙ্গে যুবদলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন রাজশাহী মহানগর যুবদলের সভাপতি শরিফুল ইসলাম জনি। তিনি বলেন, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও সংগ্রহ করেছেন। ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে, তাদের কেউ যুবদলের সঙ্গে জড়িত নন। তারা কারা, সে বিষয়েও তিনি জানেন না।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার ও মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে পুলিশ গিয়ে সেখানে কাউকে পায়নি। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









