একটি কর্মজীবনের সমাপ্তি, অসংখ্য স্মৃতির বিদায়। দীর্ঘদিনের চেনা ক্যাম্পাস, সহকর্মীদের মুখ, প্রিয় শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর একসঙ্গে পথচলার গল্প—সবকিছু পেছনে ফেলে অবসরে গেলেন পাবনার আটঘরিয়ার দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হক। তাদের বিদায়বেলায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেউই। দুই শিক্ষক যেমন অশ্রুসিক্ত হয়েছেন, তেমনি তাঁদের বিদায়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরাও।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত অবসরজনিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৈরি হয় এমনই এক আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘ কর্মজীবনে গড়ে তোলা সম্পর্ক, শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা আর শিক্ষাঙ্গনের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতিচারণে বারবার ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। বিদায় মানেই যে কেবল কর্মজীবনের ইতি নয়, বরং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার গল্প—দুই শিক্ষকের বিদায় যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।
দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম হেলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিদুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আতাউর রহমান রানা, সিনিয়র সহসভাপতি রবিউল ইসলাম রবি, সদস্যসচিব মনোয়ার হোসেন আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক আছিম উদ্দিন এবং আটঘরিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি আজাহার আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হক নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের ইতিহাসে তাঁদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অবসর জীবনে তাঁরা সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করুন—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিদুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকদের অবদান কখনো অবসর নেওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় না। তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করেন। বিদায়ী দুই শিক্ষক তাঁদের কর্মের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য সবসময় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
উপাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “সাইদুর রহমান ও আব্দুল হক ছিলেন আমাদের অভিভাবকতুল্য সহকর্মী। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও আন্তরিকতা সবসময় আমাদের পথ দেখিয়েছে। তাঁদের এই শূন্যতা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমরা তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনের সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করি।”
দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, “দীর্ঘ কর্মজীবনে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছি, তা কখনো ভোলার নয়। দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের সঙ্গে আমার আবেগ ও ভালোবাসা আজীবন অটুট থাকবে।”
সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হকও স্মৃতিময় কর্মজীবনের কথা তুলে ধরে বলেন, “এই কলেজে দায়িত্ব পালনকালে সবার কাছ থেকে যে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি, তা আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য রইল আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে শুভকামনা।”
দুই শিক্ষকের বক্তব্যে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের কর্মস্থলের প্রতি গভীর টান, সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আত্মিক সম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য রেখে যাওয়া ভালোবাসা। তাঁদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো একটি অধ্যায়, তবে স্মৃতি আর অবদান থেকে যাবে কলেজের মানুষগুলোর মাঝে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমানের মানপত্র পাঠ করেন আব্দুল মজিদ নাদিম। সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হকের মানপত্র পাঠ করেন সহকারী অধ্যাপক এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান। সহকারী অধ্যাপক নীহার আফরোজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথিরা দুই শিক্ষকের কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন।
পরে বিদায়ী অধ্যক্ষ সাইদুর রহমানকে ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধান অতিথি হাবিবুর রহমান হাবিব। তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন উপাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম। অন্যদিকে, সহকারী অধ্যাপক আব্দুল হকের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন ইউএনও তাহমিদুল ইসলাম। তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন আতাউর রহমান রানা ও মনোয়ার হোসেন আলম।
কলেজের বিভিন্ন বিভাগ, গভর্নিং বডি এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুই শিক্ষকের হাতে তুলে দেওয়া হয় নানা উপহারসামগ্রী। বিজ্ঞান বিভাগের পক্ষে আবুল লতিফ, অর্থনীতি বিভাগের পক্ষে এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান ও কামরুজ্জামান এবং কমিটির পক্ষে রবিউল ইসলাম রবিসহ কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও দুই শিক্ষকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির ইতি ঘটেনি। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো সময়, শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ আর কলেজের প্রতি দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে তাঁদের কর্মজীবনের গল্প বেঁচে থাকবে দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজের মানুষের হৃদয়ে।
কর্মজীবন থেকে অবসর নিলেন তারা, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তাদের অর্জিত সম্মান, ভালোবাসা ও স্মৃতির জায়গা থেকে যাবে অমলিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









