ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করা এবং কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেত্রে তার আচরণ আশ্চর্য রকম সংযত। কারণটা সম্ভবত তিনি জানেন—হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, শেষ করা ততটা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিরা নতুন করে সামরিক তৎপরতা বাড়ালেও ট্রাম্প এখন পর্যন্ত তাদের ওপর নতুন করে মার্কিন বিমান হামলা চালাননি। গত বছরের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেটিও ভাঙেননি। সৌদি আরব আরও মার্কিন সহায়তা চাইলেও ট্রাম্প আপাতত সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন না। তিনি বরং জোর দিয়ে বলছেন, হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প বলেন, ‘হুতিরা আমাদের ফোন করেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না।’
অবশ্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কতক্ষণ একই থাকবে, তা বলা কঠিন। তিনি প্রায়ই অবস্থান বদলান। তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তত বোঝা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে কখন না ঢোকাই ভালো—সে বিষয়ে তিনি হয়তো কিছু শিক্ষা পেয়েছেন। হুতিরাও চায় যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাত থেকে দূরে থাকুক। একজন হুতি কর্মকর্তা আমাকে লিখিত বার্তায় বলেন, ‘আমরা মনে করি না, যুক্তরাষ্ট্রের আবার ইয়েমেনে জড়িয়ে পড়ার কোনো কারণ আছে।’
ট্রাম্পের সামনে অবশ্য ইরান নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে নতুন একটি যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে তাঁর অনীহা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন ইয়েমেনবিষয়ক সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং। ইরান ও হুতিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় দুটি সংঘাতকে পুরোপুরি আলাদা করাও যায় না। ইরান হুতিদের অস্ত্র ও অর্থসহায়তা দেয়। দুই পক্ষেরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। হরমুজ প্রণালি যেমন ইরানের কৌশলগত হাতিয়ার, তেমনি বাব আল-মান্দাব প্রণালি হুতিদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের মাধ্যম। দুটি জলপথই বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হুতিদের ইরানের নিছক ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা, যারা হুতিদের নিয়ে কাজ করেছেন, বলেন—তাদের নিজেদের ইতিহাস, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অভিযোগগুলোর একটি হলো ইয়েমেনের ওপর অবরোধ। হুতিদের ভাষায়, তারা নিজেদের দেশ রক্ষার জন্যই লড়ছে। একজন হুতি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা শুধু নিজেদের এবং নিজেদের দেশকে রক্ষা করছি।’
ওয়াশিংটন এখনো সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিও রয়েছে। হোয়াইট হাউসও বলেছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পাশে থাকবে। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে আবার বড় মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেওয়া হচ্ছে—এমন লক্ষণ নেই। এর একটি কারণ গত বছরের অভিজ্ঞতা। ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে মার্কিন বিমান অভিযান হুতিদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেনি। ট্রাম্প তখন দাবি করেছিলেন, হুতিরা ‘আত্মসমর্পণ করেছে’। এর পাশাপাশি ইরানের যুদ্ধের কারণে মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে বিশ্লেষকদের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যনীতি সম্পর্কে অবহিত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘রুবিও জটিলতাটা বোঝেন। কারা কারা খেলোয়াড়, সে বিষয়ে তাঁর ভালো ধারণা আছে।’
তবু ওয়াশিংটনে সবাই একমত নয়। কেউ কেউ মনে করেন, সৌদি আরবকে সহায়তা করতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর জন্য বিমান হামলা চালানো উচিত। অন্যরা সতর্ক করছেন, এমনকি মার্কিন স্থলসেনা পাঠালেও হুতিদের থামানো সহজ হবে না। কারণ হুতিরা গত কয়েক বছরে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তারা নিজেদের অস্ত্র তৈরি করছে, ইরান থেকে পাওয়া অস্ত্রের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং তাদের অস্ত্রভান্ডারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও শুরু হয়েছে বলে খবর রয়েছে।
ইয়েমেন যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন কমিয়ে পাল্লা বাড়িয়েছে, গাইডেন্স ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। ইরান থেকে নতুন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হলেও তারা সময়ের সঙ্গে তা কাটিয়ে উঠতে পারে। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা এপ্রিল অ্যালির মতে, হুতি নেতৃত্বের বড় অংশ তরুণ। তারা যুদ্ধের মধ্যেই বড় হয়েছে এবং বারবার কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। ফলে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রেসিডেন্টরাও সহজ পথ পাননি। বারাক ওবামা হুতিদের বিরুদ্ধে অন্তত একটি হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। জো বাইডেনও গাজা যুদ্ধের সময় হুতিদের জাহাজে হামলার জবাবে একাধিক মার্কিন হামলা চালান। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সৌদি যুদ্ধপ্রচেষ্টায় মার্কিন সহায়তা কমান এবং রিয়াদকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিতে যেতে উৎসাহিত করেন।
হুতি-সমর্থক ইয়েমেনি সাংবাদিক হুসেইন আল-বুখাইতি অবশ্য সৌদি আরবকেই ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি দুর্বল করার জন্য দায়ী করেন। তাঁর দাবি, সৌদি অবরোধ তুলে না নেওয়ায় পরিস্থিতি বদলায়। পরে সৌদি হামলার অভিযোগের পর হুতিরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। বুখাইতির যুক্তি, বিশ্ব যখন তেলের দাম ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন ইয়েমেনের মানুষের জীবন নিয়েও ভাবা উচিত। তবে হুতিদের নিজেদের শাসনব্যবস্থার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। তারা কঠোর দমন-পীড়ন চালায় এবং তাদের শাসন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এক মানবিক সহায়তা কর্মকর্তা হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জীবনকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বুখাইতিকে যখন বলা হয়, ইরানের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে থাকা সৌদি আরবের দুর্বল মুহূর্তে হামলা চালানো কিছুটা সুযোগসন্ধানী কি না, তিনি তা অস্বীকার করেননি। তাঁর উত্তর, ‘শত্রু দুর্বল হলে সেই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া অন্যায় নয়। আর আমাদের শত্রু সৌদি আরব।’ রিয়াদ এখন হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এতে ট্রাম্পের জন্য দূরে থাকা আরও কঠিন হতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথে খুব বেশি শক্তি দিচ্ছে না। সৌদি-হুতি সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশেষ দূত নেই। ইয়েমেন বা সৌদি আরবেও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নেই। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আলোচকেরা ইরান, গাজা ও ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত। ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারী ওমানের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এখন খুব উষ্ণ নয়। অথচ হুতিদের একটি কূটনৈতিক শাখা রয়েছে। ওমানে বিদেশিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও হয়। সাবেক আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারা বলেন, হুতি প্রতিনিধিরা আলোচনায় কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ, কখনো আকর্ষণীয়, আবার একই সঙ্গে অত্যন্ত হিসাবি। তবে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে বোঝা কঠিন। হুতিদের কাঠামো কঠোরভাবে শ্রেণিবিন্যস্ত, ধর্মীয়ভাবে অনড় এবং বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে গভীর সন্দেহপ্রবণ।
সাবেক জাতিসংঘ বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথস ইয়েমেনে হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু সেই যোগাযোগও হয়েছিল নিরাপদ বাড়িতে পর্দার মাধ্যমে। গ্রিফিথসের ভাষায়, হুতিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা সহজ নয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা গেলেও তারা নিজেদের চারপাশে একটি দূরত্ব বজায় রাখে। ‘সত্যের খোঁজে আমি দেখেছি, সত্যটা প্রায়ই অধরা থেকে গেছে,’ তিনি বলেন।
ট্রাম্পের সামনে তাই একটি কঠিন হিসাব। হুতিদের শক্তি কমাতে গিয়ে তিনি যদি নতুন যুদ্ধ শুরু করেন, তাহলে সেটি ইয়েমেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা, সৌদি আরব, ইরান এবং বিশ্ববাণিজ্য—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর যদি তিনি যুদ্ধ এড়াতে চান, তাহলে কূটনীতিকে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। হুতিদের সমস্যা সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে দমন করা যেতে পারে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক হিসাব, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় ক্ষোভ না বুঝে সেই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন।
ট্রাম্পের জন্য প্রশ্নটি তাই শুধু—হুতিদের আঘাত করা যাবে কি না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, ‘আরেকটি যুদ্ধ শুরু না করেও কীভাবে তাদের সামলানো যায়।’ ইয়েমেনের ইতিহাস বলছে, এই দুটির মধ্যে দ্বিতীয় পথটিই হয়তো বেশি কঠিন। আর সেই কারণেই সেটিই সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক মনোযোগ দাবি করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









