রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

কুষ্টিয়া শহরে বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের দাপট, ধুলো দূষণে জনজীবন বিপর্যস্ত

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

কুষ্টিয়া শহরে বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের দাপট, ধুলো দূষণে জনজীবন বিপর্যস্ত

কুষ্টিয়া শহরের গড়াই ও পদ্মা নদী থেকে উত্তোলিত বালি খোলা ড্রাম ট্রাক ও করিমনযোগে পরিবহনের করায় শহরজুড়ে তীব্র ধুলো দূষণ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন শত ড্রাম ট্রাক শহরজুড়ে সড়কে দাপিয়ে চলছে। বালি বহনকারী অধিকাংশ গাড়িতে ত্রিপল না থাকায় বালু বাতাসে উড়ে বাসাবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক ঘেঁষা এলাকা দিনরাত ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে। এতে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, ভ্যানচালকসহ সাধারণ মানুষ শ্বাসকষ্ট ও নানান স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের ধুলা ও ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্র, লিভার, কিডনি ও চোখে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন অভিযানের কথা বললেও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নিয়মিত আলোচনা ও অভিযোগের পরও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। ধুলোবালিতে সবচেয়ে ভোগান্তিতে আছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা।

সরেজমিন কুষ্টিয়া শহরের জুগিয়া এলাকায় গেলে দেখা যায়, জুগিয়া বালির ঘাট থেকে ড্রাম ট্রাকে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রাম ট্রাকের ডালার নিচ পর্যন্ত বালি ভরে তাতে উপরে পানি ছিটিয়ে ত্রিপল দিয়ে পরিবহন করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। অপরদিকে এলাকার একমাত্র পিচ ঠালাই সড়কটি চিহ্ন পর্যন্ত নেই। ঝুকি নিয়ে ভাঙ্গাচুরা সড়ক দিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন প্রকার যানবাহন। পথ চলতে দূর্ভোগে পড়ছে পথচারীরা। সড়কটির পাশের ঘরবাড়িগুলো ধুলায় ঢেকে গেছে। সড়কটিতে চলাচলরত প্রায় ১০ বছর বয়সী স্কুল ছাত্র রুবেল অভিযোগ করেছে, সকাল বেলা ড্রাম ট্রাকগুলো গেলে স্কুলে যেতেও ধুলো মুখে ঢুকে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। যুগিয়া এলাকার কলেজ ছাত্রী আয়েশা খাতুন জানান, সারাদিন বড় বড় বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তার অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে, ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি মুমূর্ষ রোগী নিয়ে যাতায়াত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে, অনেকে শ্বাসকষ্টসহ নানান শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভুগছেন।

পথচারী মো. হিরো জানান, দিনরাত ভারী বালুবাহী ট্রাক চলাচলে ঘরের ভাতের হাঁড়ি থেকে শুরু করে বিছানার চাদর পর্যন্ত ধুলায় নোংড়া হয়ে যায়, রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়ে। ভ্যানচালক শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বৃষ্টি এলে কাদামাটি ও গর্তের কারণে সড়কে যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, সারাক্ষণ আতঙ্ক নিয়ে চলতে হয়। এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান লাকি অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসন চেষ্টা করছে বললেও বিভিন্ন ফোরাম, আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক এবং পত্রপত্রিকায় ধারাবাহিক লেখালেখির পরও বাস্তবে তেমন পরিবর্তন আসছে না। তার অভিযোগ, বিষয়টি খুব জটিল না হলেও প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি এবং অদৃশ্য প্রভাব বা উদাসীনতার কারণে খোলা ড্রাম ট্রাকে বালি পরিবহন বন্ধ হচ্ছে না।

কুষ্টিয়া সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম বলেন, খোলা ট্রাকে বালি পরিবহনের ফলে তৈরি হওয়া ধুলা ও পুরোনো, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির কালো ধোঁয়া মানুষের শ্বাসতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ফুসফুসের রোগ এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার মতে, এসব দূষিত কণা রক্তের মাধ্যমে লিভার, কিডনি, প্রজনন তন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে গিয়ে হেপাটাইটিস, কিডনি রোগ, বন্ধ্যত্ব ও গর্ভপাতের মতো জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, পাশাপাশি চোখের প্রদাহ ও দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাবিবুল বাসার বলেন, বালু পরিবহনের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে খোলা অবস্থায় বালি বহন বন্ধ করা যায় এবং নিয়ম মেনে বালি পরিবহন নিশ্চিত হয়। কুষ্টিয়া ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর কাজী হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, বালুবাহী ড্রাম ট্রাকগুলো বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন করা এবং বালু উত্তোলনও সরকার অনুমোদিত টেন্ডারের মাধ্যমে হওয়ায় কাগজে-কলমে সরাসরি অবৈধ বলা কঠিন। তবে তিনি স্বীকার করেন, শহরের ভেতরে মালবাহী যানবাহনের চলাচলে সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও অনেকে নিয়ম ভেঙে খোলা ও অরক্ষিতভাবে বালি বহন করছে, যা আইনত অবৈধ এবং জনদুর্ভোগের মূল কারণ।

এদিকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন বলেন, বালুবাহী ট্রাকের কারণে শহরবাসী ঘুমাতে পারছে না এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ে বৈঠক করে সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি ড্রাম ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন যাচাই করা হবে, অনিয়ম পেলে গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জনউপদ্রব সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করা হবে, ফলে অদূর ভবিষ্যতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বালু উত্তোলনের টেন্ডার প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা টেন্ডার বাবদ সব টাকা পরিশোধ করেননি এমন তথ্য পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজন হলে টেন্ডার বাতিলও করা হতে পারে।

এ সবকিছুর মধ্যে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার কাছেও এই ইস্যু উত্থাপিত হয়েছে। সম্প্রতি জেলা বিএনপির কার্যালয়ে বিএনপির জেলা সদস্য সচিব ও পরাজিত প্রার্থী জাকির হোসেনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে কুষ্টিয়া শহরকে খোলা বালুবাহী ট্রাকের ধুলো থেকে রক্ষার জন্য এমপির হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়, আর আমির হামজা কেন্দ্রীয় সরকারের অংশীদার হিসেবে স্থানীয়ভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে জানান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও বিশেষজ্ঞ-প্রশাসনের বক্তব্য মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, কুষ্টিয়ায় বালুবাহী ট্রাকের কারণে সৃষ্টি হওয়া ধুলো দূষণ শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্য ও সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জটিল সমস্যা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে কুষ্টিয়াবাসী এখন কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগের অপেক্ষায়।


কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.