দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আলগারচর নামের একটি গ্রাম। এ গ্রামটি একটু ভিন্ন। ভোর থেকে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে গ্রামের স্বপ্নবাজ মানুষে কর্মব্যস্ততার শুরু। স্নিগ্ধ সকালে সবুজ ঘাসের ডগায় যখন শিশির বিন্দু মুক্তোর আভা ছড়ায় ঠিক তখন আলগীরচর গ্রাম লাল, হলুদ আর বেগুনি রঙে রাঙিয়ে তোলে ফসলের মাঠ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন রঙিন খেলায় মেতে উঠেছে। কাছে যেতেই রঙিন কাপড় দেখে আশ্চর্য হওয়ার পালা। মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষের রঙিন স্বপ্ন, পুরনো কাপড়।
উচ্চ ও মধ্যবিত্তের ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া কাপড় কিনে রং দিয়ে বিক্রি করাই এ গ্রামের মানুষের অন্যতম ব্যবসা। শুরুটা ১৯৯৫ সালে, আলগীরচর গ্রামের তাঁতিরা আধুনিক যন্ত্রচালিত মেশিনের (পার্লোম) সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তখন সর্বস্বান্ত। দিশেহারা তাঁতিরা বাপ-দাদার ব্যবসা ছেড়ে শ্রমিকের কাজ করতে শুরু করেন। তাদেরই একজন জাহাঙ্গীর খান। ঢাকার বেগম বাজার থেকে পুরান কাপড় ৩-৬ টাকায় কিনে ওয়াশ করে চট্টগ্রামের বহদ্দার হাট, মুলাদি বাজার ও বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় ফেরি করে বিক্রি করেন। জাহাঙ্গীর খান এ ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন দেখে ধীরে ধীরে পুরো গ্রাম এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পরে ২০০১ সাল থেকে তারা মোগলটুলি থেকে কাপড়ের রঙ এনে তা কাপড়ে দিয়ে নতুন বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে এ ব্যবসার সঙ্গে গ্রামের প্রায় ৪০০ পরিবারের প্রায় পাঁচ হাজার লোক জড়িত। এখানের অধিকাংশ মানুষের হাত কাপড়ের রংয়ে রঙিন হয়ে আছে।
জাহাঙ্গীর খান বলেন, ‘আলগীরচরের মানুষ তাঁত ব্যবসার ওপর নির্ভর ছিল। তাঁত ব্যবসায় লোকসান দিতে দিতে সর্বস্বান্ত হয়ে আমি এ ব্যবসায় চলে আসি। ঢাকার বেচারাম দেউড়ী থেকে ৩-১৩ টাকা দিয়ে পুরান কাপড় কিনি। বাড়িতে এনে বাছাই করে তিনটি ভাগে রাখি। তারপর জামাগুলো উল্টিয়ে সেলাই করার পর হলুদ, লাল ও বেগুনি রং দিয়ে শুকিয়ে বিক্রি করি।’

পুরান কাপড়ের ব্যবসায়ী আফসার উদ্দিন বলেন, ‘২৫ বছর ধরে আমরা এ ব্যবসা করে আসছি। এ ব্যবসার সুফল অনেকেই ভোগ করছেন। কেউ সেলাই করছেন, কেউ রং করছেন, কেউ রোদে শুকিয়ে এবং কাপড় বিক্রি করে টাকা রোজগার করছেন। এ কাপড়গুলো কিনে অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ। কোন থেকে রং দিয়ে বিক্রির উপযুক্ত করতে প্রতিটি জামায় খরচ ১৬-২৫ টাকা। আমরা বাজারে বিক্রি করি ৩০ থেকে ৫০ টাকা।’
জানা যায়, প্রতিটি জামা সেলাই করতে দুই টাকা, রং করতে দুই টাকা, রোদে শুকাতে শতকরা ৪৫ টাকা করে দিতে হয়। এতে অনেক পরিবারের অভাব দূর হয়েছে বলে জানান বারদী ইউনিয়নের রাজনীতিবিদ ও সমাজ সেবক মো. সেলিম হোসেন দীপু।
তিনি জানান, গ্রামের সবাই কাজে ব্যস্ত থাকায় এ গ্রামে মাদক, সন্ত্রাস কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত নয়।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ, সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের নবনির্বাচিত এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘আলগীরচরের মানুষকে সাধুবাদ জানাই, এ ব্যবসা করে অনেকেই ভালোভাবে জীবিকা চালাচ্ছেন এবং সমাজের অবহেলিত একটা অংশের মানুষের জন্য স্বল্পদামে পরিধেয় কাপড় তুলে দিতে পারছে। এ ব্যবসায় নতুনত্ব আছে। মানুষ চাইলেই যে সৎভাবে বেঁচে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে, আলগীরচর গ্রামের মানুষ তার প্রকৃষ্ট উদহারণ।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









