সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ব্রহ্মপুত্র নদে চরমাদাখালী এলাকা থেকে ড্রেজিংকৃত কোটি টাকার সরকারি বালু হরিলুটের মহোৎসব চলছে। সরকারি ইজারার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলেও থেমে নেই বালু বেচাকেনা। প্রশাসনের নাকের ডগায় দিন-রাত ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই করে বালু সরিয়ে নেওয়া হলেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইজারাদারের অপকৌশলে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ০২ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সরকারি আদেশ অনুযায়ী, ত্রিশাল উপজেলার চরমাদাখালী মৌজার খলা কলা বাগান (বাজারীদের খলা) সংলগ্ন ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ঘনফুট বালু বিক্রির জন্য চুক্তি করা হয়। ‘মেসার্স অর্ক এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো: মাজহারুল আলম জুয়েলকে (পিতা- মৃত মো: গোলাম মোস্তফা, ৫ নং ওয়ার্ড, ত্রিশাল) বাংলা ১৪৩৩ সনের ১৮ শ্রাবণ হতে ১৬ আশ্বিন (০২ আগস্ট ২০২৬ থেকে ০১ অক্টোবর ২০২৬) পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। এই ইজারা বাবদ ভ্যাট ও আয়করসহ সর্বমোট ৭৪ লাখ ১ হাজার ৫৬২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দখল হস্তান্তর গ্রহণ করেন ইজারাদার।
চুক্তিপত্রের স্পষ্ট শর্ত অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষে কোনোভাবেই আর বালু পরিবহন বা বিক্রির আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে গেলেও অবাধে চলছে বালু উত্তোলন ও বিক্রি। স্থানীয়দের দাবি, বাজারে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা, সেই সরকারি সম্পদ বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা আকবর আলীর মাধ্যমে যোগসাজশ করে মাত্র ৫০ লাখ টাকার কাছাকাছি মূল্যে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গত ১ তারিখে ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখানে বালু বিক্রির ধুম দেখে তা বোঝার উপায় নেই। দিন-রাত সমানতালে বড় বড় ট্রাকে বালু তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এলাকার মানুষ যখন এই অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে কথা বলতে যায়, তখন তাদেরকে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। সরকারি বালু অবৈধভাবে বিক্রির প্রতিবাদ করায় আমি সহ আমাদের ১২ জনের নামে চাঁদাবাজি মামলা দিয়েছে ইজারাদার জুয়েল মন্ডল। বিদায়ী প্রত্যাহার হওয়া ইউএনও আরাফাত সিদ্দিকী গোপনে জুয়েলকে এই কাজ দিয়েছিলো। আমরা সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এমন নীরব ভূমিকা দেখে হতাশ।”
আরেক স্থানীয় অধিবাসী কামাল উদ্দীন বলেন, ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, “সরকারি বালু এভাবে লুটপাট করে বিক্রি করা হলেও কোনো অদৃশ্য শক্তির কারণে স্থানীয় প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা আকবর আলী, স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস এবং ইউএনও অফিসের কতিপয় অসাধু লোককে ম্যানেজ করেই অর্ক এন্টারপ্রাইজের মালিক জুয়েল এই বেপরোয়া কাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকাশ্যে কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি হরিলুট হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স অর্ক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো: মাজহারুল আলম জুয়েল জানান, তারা সার্বিক নিয়ম মেনে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন এবং কিছু জটিলতার বিষয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্ব ঠকানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা আকবর আলী মোবাইল ফোনে জানান, সব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং ইজারা প্রক্রিয়ায় যাবতীয় সরকারি নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসনাত জাহান খান জানান, “চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার পর কোনো অবস্থাতেই বালু বিক্রি বা সরানোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আমরা ইজারাদারকে নির্ধারিত মেয়াদের পর বালু বিক্রি না করার জন্য বারবার সচেতন ও সতর্ক করেছি। প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য করে যদি কেউ এখনো অবৈধভাবে বালু বিক্রি চালিয়ে থাকে, তবে খুব শীঘ্রই ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









