পাবনায় একের পর এক শিশু ও কিশোরী হত্যা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে। সাত দিন নিখোঁজ থাকার পর ১০ বছর বয়সী কামরুন্নাহার কলির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার, তমা খাতুন, হাফসা, জামিলা ও রিয়া খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং অপরাধের পর ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এসব ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—শিশুদের নিরাপত্তায় বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, অপরাধের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচার কত দূর এগিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে তার বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত বক্তব্যের ভিত্তিতে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
কলির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার আসামিদের বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর চালায় বলে খবর প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি একদিকে শিশুনিরাপত্তা, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব সামনে এনেছে।
তমা, হাফসা, জামিলা ও রিয়ার মৃত্যু এর আগেও পাবনায় একাধিক শিশু ও কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর আটঘরিয়ার ষাটগাছা গ্রামে ১৬ বছর বয়সী তমা খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় সাবেক ইউপি সদস্য আদম আলীকে প্রধান আসামি করা হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ ওঠে, জামিনে মুক্তির পর তিনি নিহতের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছিলেন। পরে ৭ সেপ্টেম্বর আদম আলী গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন। তবে তাঁর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তমা হত্যা মামলার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পাবনা শহরের শালগাড়িয়া সরদারপাড়া এলাকা থেকে নয় বছর বয়সী হাফসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। মামলাসংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে ৬৫ বছর বয়সী সুফিয়া খাতুন ও তাঁর ১৫ বছর বয়সী নাতনি জামিলা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, কিশোরীকে অপহরণের চেষ্টায় বাধা দেওয়ায় দাদিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টিও তদন্তের প্রাথমিক আলোচনায় আসে।
একই বছরের জুনে পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের পদ্মা নদী থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া খাতুনের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আসামি গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। পরে আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেখিয়েছে, একটি অপরাধের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা কীভাবে আরও প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
সর্বশেষ ১০ অক্টোবর আটঘরিয়া উপজেলার তারাপাশা গ্রামে এক বাক্প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে মো. আসাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারী চিৎকার করলে অভিযুক্ত তাঁকে গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করেন। তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে এক চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীকেও শ্লীলতাহানির চেষ্টা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং ঘটনার প্রকৃত বিবরণ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
শিশু ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উদ্বেগের। মাদক, মারামারি, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। সুজানগরে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে সংঘটিত দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদেও স্থানীয়ভাবে ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করা, মাদক থেকে দূরে রাখা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
পাবনার সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. একেএম শওকত আলী খান বলেন, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারিবারিক সচেতনতা ও সন্তানের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশাসনের কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা এবং কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নজরদারি বাড়াতে হবে।
পাবনা সদর থানার ওসি মো. তারিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে। কোনো শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুসন্ধান, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা, যৌন সহিংসতার অভিযোগে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রতিটি মামলার তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিশু সুরক্ষায় প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা জরুরি। কোনো অভিযোগের বিচার যেন প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা সামাজিক চাপের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কলি, তমা, হাফসা, জামিলা ও রিয়ার মৃত্যুর ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের খবর নয়; এগুলো শিশুদের নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—পাবনায় শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসছে, আর সেই পরিবর্তনের সুফল শিশুরা কবে থেকে পাবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









