একুশ মানেই বেদনা, গৌরব আর শপথের পুনরুচ্চারণ। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে যশোরে যখন ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ১ মিনিট স্পর্শ করল, তখন সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক শহীদ মিনার চত্বরে নেমে এলো এক আবেগঘন পরিবেশ। নীরবতা, ফুলের সুবাস আর মানুষের অশ্রুসজল শ্রদ্ধায় ভরে উঠল পুরো এলাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম প্রহরেই শহীদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, একুশ আমাদের শেখায় মাথা নত না করতে। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস না করতে। আজ শহীদ বেদিতে দাঁড়িয়ে শপথ নিতে চাই বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় আমরা দেশি-বিদেশি কারও কাছে আপস করবো না।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে তিনি একে জীবনের গৌরব ও বিরল সম্মান বলে উল্লেখ করেন। তাঁর কণ্ঠে তখন ছিল আন্দোলনের স্মৃতি, দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আর নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, যে গণতন্ত্রের জন্য আমরা দীর্ঘদিন লড়াই করেছি, সেই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে। সেই সরকারের একজন অংশ হয়ে জেলা প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে ফুল দিতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের।
তিনি আরও স্মরণ করেন সাম্প্রতিক আন্দোলনে আত্মত্যাগীদের। ভাষা শহীদদের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি। তার ভাষায়, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আমরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থই হবে সর্বাগ্রে। জনগণ যেভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ওপর আস্থা রেখেছেন, সেই আস্থার মর্যাদা রাখতেই কাজ করবে সরকার।
এদিকে একুশের প্রথম প্রহরে যশোরে ছিল মানুষের ঢল। রাত সাড়ে ১১টা থেকেই এমএম কলেজ চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তরুণ-তরুণী, প্রবীণ, শিশু সব বয়সী মানুষ হাতে ফুল নিয়ে জড়ো হন শহীদ মিনারে। অনেকেই পরিবার নিয়ে এসেছেন, শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন ফুল, শিখিয়েছেন একুশের ইতিহাস। কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে স্তব্ধ উচ্চারণ 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…'
প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা জানায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সিভিল সার্জন অফিস, বিআরটিএ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফায়ার সার্ভিস, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও পৃথকভাবে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ফুল দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কিছুক্ষণ, যেন ভাষা শহীদদের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









