ভবন আছে, আছে সাতটি ল্যাব, রয়েছে শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থাও। পাঁচ একর জমিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে নার্সিং কলেজ। অথচ সেই কলেজেই চার ব্যাচের ১৫৮ শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র একজন শিক্ষক। সাতটি ল্যাবের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র একটি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ। অন্যদিকে, হোস্টেলে গ্যাস ও পানির সংকট, নিরাপত্তাকর্মীর অভাব এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার জটিলতায় বন্ধ রয়েছে শিক্ষাবৃত্তি।
এ চিত্র শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা এলাকায় অবস্থিত আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজের। দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো গড়ে উঠলেও শিক্ষক, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের অভাবে ভবিষ্যতে দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে ওঠা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়া নার্সিংয়ের মতো ব্যবহারিকনির্ভর পেশায় তাঁরা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন?
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে প্রায় পাঁচ একর জমিতে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে চারটি ব্যাচে ১৫৮ শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছেন। তাঁদের পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। ২২টি বিষয়ে পাঠদান, একাধিক ব্যাচের ক্লাস নেওয়া, নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষককে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অধ্যক্ষকেও পাঠদানে অংশ নিতে হচ্ছে।
এক শিক্ষকের ওপর ১৫৮ শিক্ষার্থীর নির্ভরতা
নার্সিং শিক্ষার প্রতিটি ধাপে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন জরুরি। কিন্তু শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
কলেজটির তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা দাস বলেন, “আমাদের ২২টি বিষয়, অথচ শিক্ষক মাত্র একজন। অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। বিষয়গুলো সব ইংরেজিতে পড়ানো হয়। একজন শিক্ষকের পক্ষে এতগুলো বিষয়ে কতটুকু শেখানো সম্ভব, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। এভাবে নিজেরা নিজেরা পড়াশোনা করে কত দূর এগোতে পারব, সেটাই আমাদের উদ্বেগ।”
শুধু পাঠদান নয়, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিয়েও হতাশ শিক্ষার্থীরা। কলেজে সাতটি ল্যাব থাকলেও চালু রয়েছে মাত্র একটি। অন্য ল্যাবগুলো সচল না থাকায় এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতিতে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থী মাহিমা আক্তার বলেন, “নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ল্যাবগুলো সচল না থাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারব কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষকসংকট দূর করে সব ল্যাব সচল করা হোক এবং পর্যাপ্ত ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করা হোক।”
একই উদ্বেগ আফসানা আক্তারের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “আমাদের ল্যাবে যেসব সরঞ্জাম থাকার কথা, তার অনেক কিছুই নেই। ল্যাবের ক্লাস না হলে শুধু পাঠ্যবই পড়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব? অন্য নার্সিং কলেজের তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। এখানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। এভাবে পড়াশোনা শেষ করে পুরোপুরি দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারব কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।”
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ছাড়া শিক্ষাজীবন শেষ হলে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে রোগীর সেবা, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাঁদের দক্ষতার ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
শিক্ষাবৃত্তি বন্ধ, বাড়ছে পরিবারের ওপর চাপ
শিক্ষার মান ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সংকটের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম খরচে পড়াশোনার প্রত্যাশা নিয়ে ভর্তি হলেও তাঁদের অনেককে নিজেদের ও পরিবারের অর্থে পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থী দিলরুবা দীপা বলেন, “আমরা সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তি হয়েছি, যাতে সরকারি খরচে পড়াশোনা করতে পারি। অথচ আমাদের আইবাস এখনো চালু হয়নি। বেসরকারি নার্সিং কলেজের মতোই আমাদের খরচ হচ্ছে। বাসা থেকে টাকা এনে খরচ চালাতে হয়। আমরা চাই, দ্রুত আইবাস চালু করা হোক।”
কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠান চালুর পর থেকে ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস) কার্যকর না হওয়ায় সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েও আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে নিয়মিত পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
হোস্টেলে গ্যাস-পানির সংকট, নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি আবাসিক সুবিধা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। হোস্টেলে গ্যাস ও পানির সংকটে দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীর অভাব।
শিক্ষার্থী আদিবা আক্তার বলেন, “আমাদের কলেজ ও হোস্টেলে কোনো নিরাপত্তাপ্রহরী নেই। যেকোনো সময় বহিরাগত লোকজন প্রবেশ করতে পারে। আমরা অনিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করছি। এ কারণে সব সময় মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আমরা চাই, কলেজে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক।”
একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, সুপেয় পানি ও রান্নার ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। অথচ এসব সুবিধার ঘাটতি তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পড়াশোনায় বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
একজন শিক্ষকের পক্ষে কতটা সম্ভব?
প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র শিক্ষক অসিমা রানী সরকারও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “২২টি বিষয়ের জন্য আমি একজন মাত্র শিক্ষক। পাশাপাশি অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। সাতটি ল্যাবের জন্য আলাদা শিক্ষক প্রয়োজন। অথচ এখানে শিক্ষক নেই, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নেই। এতগুলো ক্লাস যেভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো কার্যত নামমাত্র ক্লাস। এখান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।”
শিক্ষকের এ বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নার্সিং শিক্ষায় শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করাই যথেষ্ট নয়; রোগীর সেবা, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুশীলন ও দক্ষ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। শিক্ষক ও ল্যাবের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীদের পেশাগত প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনবল ও প্রশাসনিক জটিলতায় থমকে প্রতিষ্ঠান
কলেজটির সংকটের পেছনে জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠান চালুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃজন এবং আইবাস কোড চালু না হওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবও দৈনন্দিন কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জাহিদ হোসেন বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি চালুর পর জনবলের পদ সৃজন ও আইবাস কোড চালু হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নেই। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের অনেক কষ্ট করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁরা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।”
তবে কবে নাগাদ শিক্ষকসংকট দূর হবে, সব ল্যাব সচল হবে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়া যাবে এবং আইবাস কার্যকর করে শিক্ষাবৃত্তি চালু করা সম্ভব হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি নার্সিং কলেজে শিক্ষার্থীদের এমন সংকট শুধু অবকাঠামো নির্মাণের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে না; বরং সরকারি অর্থে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। একটি ভবন, কয়েকটি ল্যাব কিংবা আবাসিক হোস্টেল নির্মাণ করলেই মানসম্মত নার্সিং শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, সচল ল্যাব, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের উপকরণ, নিরাপদ আবাসন এবং কার্যকর প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
ডামুড্যার এ কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ, সব ল্যাব সচল, ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষাবৃত্তি চালুর মাধ্যমে তাঁদের শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা দূর করা হবে।
কারণ, তাঁদের হাতে শুধু একটি সনদ তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব পালনের উপযোগী দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। ৪০ কোটি টাকার অবকাঠামোর প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








